• মঙ্গলকাব্যের পাঁচটি অংশের মধ্যে দেবখণ্ড বা স্বর্গ খণ্ড অংশে মূলত স্বর্গীয় দেবতাদের মহিমা, কার্য, পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার পারস্পরিক সম্পর্ক, দেবতার শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্বর্গীয় পটভূমিতে তাদের দ্বন্দ্ব ও চক্রান্ত বর্ণিত হয়। এখানে দেবতার পৃথিবীতে পূজা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।
--------------------------
• মঙ্গলকাব্য:
- মঙ্গলকাব্য হলো মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি আখ্যানধর্মী কাব্য।
- এই কাব্যের মূল সাধারণত দেব-দেবী ও তাদের আখ্যানভাগ।
- এই যুগের কবিরা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে কাব্য রচনা শুরু করতেন এবং প্রায়শই সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ, পিতা-মাতা বা রাজাদের স্তুতি দিয়ে কাহিনি শুরু হত।
- মঙ্গলকাব্যের কাহিনিতে নায়করা সাধারণত স্বর্গভ্রষ্ট বা শাপভ্রষ্ট দেবতা, যারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে মর্ত্যে মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাদের স্ত্রীও একইভাবে জন্ম নেন।
- মর্ত্যে তারা মানুষের মতো আচরণ করেন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে দেবীর পূজা প্রচারের পরে শাপমুক্ত হয়ে আবার স্বর্গে ফিরে যান।
- মঙ্গলকাব্য সমাজ ও ধর্মের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
- এতে দেখা যায় দুঃখের কাহিনি, বারমাসী গান, চৌতিশা, নারীর পতি নিন্দা, রন্ধনশিল্প ইত্যাদির বর্ণনা।
- কাব্যটি ছন্দপয়ার ও ত্রিপদী আকারের হয়, যা মূলত পাঁচালি ধরনের এবং মঞ্চে উপস্থাপন করা হত।
- একটি সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্যে সাধারণত পাঁচটি অংশ থাকে:
- বন্দনা,
- আত্মপরিচয়,
- দেবখণ্ড,
- মর্ত্যখণ্ড, এবং
- শ্রুতিফল।
- মঙ্গলকাব্যকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
- প্রথম হলো লৌকিক ধারা, যা খাঁটি মঙ্গলকাব্য হিসাবে পরিচিত।
- এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত-
- মনসামঙ্গল,
- চণ্ডীমঙ্গল,
- কালিকামঙ্গল (বিদ্যাসুন্দর),
- সারদামঙ্গল,
- শিবমঙ্গল,
- শীতলামঙ্গল,
- রায়মঙ্গল,
- ষষ্ঠীমঙ্গল,
- সূর্যমঙ্গল।
- দ্বিতীয় হলো পৌরাণিক ধারা, যা বিশুদ্ধ পুরাণকেন্দ্রিক।
- এর মধ্যে রয়েছে-
- অন্নদামঙ্গল,
- গৌরীমঙ্গল,
- ভবানীমঙ্গল,
- দুর্গামঙ্গল,
- কমলামঙ্গল,
- গঙ্গামঙ্গল,
- চণ্ডিকামঙ্গল।
- মঙ্গলকাব্যের প্রধান শাখা হলো তিনটি—
- মনসামঙ্গল, যা তুলনামূলকভাবে প্রাচীনতম,
- চণ্ডীমঙ্গল,
- এবং তুলনামূলকভাবে আধুনিক- অন্নদামঙ্গল।
--------------------------
অন্যদিকে,
- 'বন্দনা অংশ'- বিভিন্ন দেব-দেবী, গুরু এবং সম্মানীয় ব্যক্তিদের স্তুতি বা অর্চনাকে কেন্দ্র করে রচিত।
- ‘আত্মপরিচয়’ অংশে কবি নিজের পরিচয়, ভৌগোলিক অবস্থান, বংশপরিচয়, এবং স্বপ্নাদেশ বা দৈবনির্দেশে গ্রন্থ রচনার কারণ বর্ণনা করেন।
- মঙ্গলকাব্যের ‘মর্ত্যখণ্ড’ (বা নরখণ্ড/মানুষের কাহিনী) অংশটি মূলত লৌকিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার এবং মর্ত্যলোকে তাঁদের পূজা প্রতিষ্ঠা করার কাহিনী নিয়ে রচিত। এই অংশে বর্ণিত হয় কিভাবে লৌকিক দেব-দেবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করে পূজা আদায় করেন।
উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।