• গণভোট সম্পর্কিত প্রাথমিক তথ্য:
- ইংরেজি ‘রেফারেন্ডাম’–এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণভোট’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ সরাসরি ভোট দেওয়ার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাদের মতামত দেয়। এটি মূলত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।
- গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনমত যাচাইয়ের জন্য গণভোটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ধরা হয়।
- উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংবিধান সংশোধন, আইন তৈরি, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা, এমনকি শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও গণভোটের আয়োজন করা হয়।
- ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে গণভোট নেওয়া হয়।
• একনজরে বাংলাদেশের সকল গণভোট:
- বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ৪ বার গণভোটের আয়োজন হয়েছে। ৪র্থ গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
- এর মধ্যে প্রশাসনিক গণভোট ২ বার অনুষ্ঠিত হয় (১৯৭৭ ও ১৯৮৫)।
- এবং সাংবিধানিক গণভোট ২ বার অনুষ্ঠিত হয় (১৯৯১ ও ২০২৬)।
• প্রথম গণভোট (১৯৭৭):
- বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৯ দফা নামে একটি নীতি ও কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
- ১৯৭৭ সালের ৩০মে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর বৈধতা ও ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচীর প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কি না তা' জানার জন্য গণভোটের আয়োজন করেন।
- ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটে জিয়াউর রহমান ৯৮.৮৭% সমর্থনসূচক ভোট আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
• দ্বিতীয় গণভোট (১৯৮৫):
- জেনারেল এরশাদ তার শাসন ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ১৯৮৫ সালের ২১শে মার্চ গণভোট অনুষ্ঠান করেন।
- এই গণভোটে একটি প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়, জেনারেল এরশাদের শাসন ও নীতি ও আদর্শের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস আছে কি না।
- নির্বাচন কমিশন সূত্রমতে জেনারেল এরশাদের পক্ষে শতকরা ৯৪.১৪% ভোট পড়ে।
• তৃতীয় গণভোট (১৯৯১):
- ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ৫ম জাতীয় সংসদ সির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
- এই ৫ম সংসদে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থার বদলে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুণঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল গৃহীত হয়।
- সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সরকার ব্যবস্থায় এরকম মৌলিক পরিবর্তন আনয়নের জন্য সংবিধান অনুযায়ী গণভোট অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
- এ অবস্থায় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না তা' যাচাইয়ের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
- উক্ত নির্বাচনে সংশোধনী বিলের পক্ষে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪২ হাজার ৮শত ৮২ টি ভোট পড়ে। অপরদিকে ৩৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭ শত ১৩টি 'না' ভোট পড়ে।
• চতুর্থ গণভোট (২০২৬):
- জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন সম্পর্কে জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। বিষয়গুলো হলো -
i) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।
ii) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।
iii) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।
iv) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।
• (EC) ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,
- চতুর্থ গণভোটে মোট ভোট পড়েছে ৬০.৮৪ শতাংশ।
- গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি। অন্যদিকে ‘না’ ভোট: ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি।
- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন।
- মোট প্রদত্ত ভোটের হিসাবে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে প্রায় ৬৮.০৭ শতাংশ, এবং ‘না’ ভোট পেয়েছে প্রায় ৩১.৯৩ শতাংশ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও প্রথম আলো।