শ্বসন (Respiration):
- শ্বসন হলো শক্তি নির্গমনকারী কতিপয় জারণ-বিজারণ বিক্রিয়ার সমষ্টি।
- শক্তি উৎপাদনকালে জটিল খাদ্যদ্রব্য সরল দ্রব্যে পরিণত হয়।
- যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জীবকোষস্থ জটিল জৈবযৌগ (খাদ্যবস্তু) জারিত হয়, ফলে জৈবযৌগে সঞ্চিত স্থিতিশক্তি রূপান্তরিত হয়ে গতিশক্তি বা রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত হয়, তাকে শ্বসন বলে।
- শ্বসনের ফলে যে শক্তি নির্গত হয় তা জীবের বিভিন্ন শক্তি শোষণকারী কার্যকলাপে ব্যয় হয়।
শ্বসনের প্রকারভেদ:
- অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে শ্বসন প্রক্রিয়াকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা: (ক) সবাত শ্বসন (Aerobic respiration) এবং (খ) অবাত শ্বসন (Anaerobic respiration)।
- যে শ্বসন ক্রিয়ার জন্য মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়, তাকে সবাত শ্বসন বলে এবং যে শ্বসন ক্রিয়ার জন্য মুক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না অর্থাৎ অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে সংঘটিত হয়, তাকে অবাত শ্বসন বলে।
শ্বসন প্রক্রিয়ার প্রভাবকসমূহ:
- নিম্নলিখিত বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রভাবকসমূহ শ্বসন ক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
যেমন-
(ক) বাহ্যিক প্রভাবকসমূহ (External factors):
১। তাপমাত্রা:
- শ্বসন ক্রিয়া কতগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টি, আর এ রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোর হার বিভিন্ন উৎসেচক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
- যেহেতু উৎসেচকসমূহের কার্যকারিতা তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল সেহেতু তাপমাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি শ্বসনের হারকেও নিয়ন্ত্রিত করে।
- তাপমাত্রা 0° সে. থেকে 30° সে. পর্যন্ত বাড়ার সাথে সাথে শ্বসন হারও ক্রমাগত বাড়ে। 0° সে. তাপমাত্রায় শ্বসন হার খুবই কম থাকে।
- সাধারণত 20°-35° C তাপমাত্রায় শ্বসন প্রক্রিয়া ভালোভাবে চলে।
- 45°C এর ওপরের তাপমাত্রায় উৎসেচকসমূহের বিক্রিয়ার হার তথা শ্বসনের হার বেশ কমে যায়।
২। অক্সিজেন:
- পাইরুভিক অ্যাসিডের পূর্ণাঙ্গ জারণের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন।
- সবাত শ্বসনে পাইরুভিক আসিড সম্পূর্ণ জারিত হয়ে CO2 ও H2O উৎপন্ন করে।
- অতএব কেবল সবাত শ্বসনেই অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে।
৩। পানি:
- কতগুলো বিক্রিয়ায় পানির প্রয়োজন হয়, অতএব প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহও শ্বসন ত্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকে।
৪। আলো:
- শ্বসনকার্যে আলোর প্রয়োজন পড়ে না সত্যি কিন্তু দিনের বেলায় আলোর উপস্থিতিতে পত্ররন্ধ্র খোলা থাকায় O2 গ্রহণ ও CO2 ত্যাগ করা সহজ হয় বলে শ্বসন হার একটু বেড়ে যায়।
৫। কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব:
- বায়ুতে CO2 এর ঘনত্ব বেড়ে গেলে শ্বসন হার কিঞ্চিৎ কমে যায়।
(খ) অভ্যন্তরীণ প্রভাবকসমূহ (Internal factors):
১। জটিল খাদ্যদ্রব্য:
- সরল খাদ্য গ্লুকোজ শ্বসন ক্রিয়ার প্রধান শ্বসনিক বস্তু।
- বিভিন্ন বিক্রিয়ায় কোষস্থ জটিল খাদ্যই গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়।
- কাজেই জটিল খাদ্যদ্রব্যের পরিমাণ ও ধরন শ্বসন প্রক্রিয়ার হারকে নিয়ন্ত্রণ করে।
২। উৎসেচক:
- শ্বসন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিক্রিয়ায় অসংখ্য উৎসেচক অংশগ্রহণ করে, তাদের উপস্থিতির ওপরই সম্পূর্ণ শ্বসন প্রক্রিয়াটি নির্ভরশীল।
৩। কোষের বয়স:
- যে কোষে প্রোটোপ্লাজম অধিক (অল্প বয়সের) সেসব কোষে শ্বসন হার অধিক হয়।
৪। কোষস্থ অজৈব লবণ:
- কোষে অজৈব লবণ অধিক পরিমাণে থাকলে শ্বসন হার বেড়ে যায়।
৫। কোষ মধ্যস্থ পানি:
- কোষে প্রয়োজনীয় পানির অভাব হলে শ্বসন হার কমে যায়।
৬। মাটিতে অজৈব লবণ:
- মাটিতে NaCl, KCI, CaCI ও MgCl এর দ্রবণের সরবরাহ বৃদ্ধি ঘটিয়ে শ্বসন হার বৃদ্ধি করা যায়।
৭। অন্যান্য প্রভাবক:
- আঘাতপ্রাপ্ত টিস্যুতে আঘাত নিরাময়ের জন্য কোষ বিভাজন দ্রুততর হয়, ফলে শ্বসন হার বেড়ে যায়।
- হাত দিয়ে পাতা মৃদু ঘষে দিলে শ্বসন হার বৃদ্ধি পায়।
উৎস: জীববিজ্ঞান প্রথম পত্র, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি (ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান)।