পরীক্ষা আর্কাইভ

বাংলাবিদ (সাহিত্য)

পরীক্ষাবাংলাবিদ (সাহিত্য)তারিখতারিখ অনির্ধারিতসময়09 minutes
মোট প্রশ্ন২৫
সিলেবাস
"বাংলাবিদ সাহিত্য পরীক্ষা - ৫: রিভিশন [পরীক্ষা: ১ - ৪ এর সকল টপিক] [লাইভ ক্লাস: ১ - ৮]"
ঘনত্ব
উত্তর
উত্তরিতবর্তমানপুনরায় দেখুনঅসম্পূর্ণ

বাংলাবিদ (সাহিত্য)

বাংলাবিদ (সাহিত্য) · তারিখ অনির্ধারিত · ২৫ প্রশ্ন

.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলা সাহিত্যকে কী নামে চিহ্নিত করা হয়েছে?
  1. তুর্কি যুগ
  2. মুসলমান পূর্ব যুগ 
  3. মধ্যযুগ
  4. রবীন্দ্র পূর্ব যুগ
ব্যাখ্যা

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের সময়কাল:
- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন শিক্ষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক।
- তিনি ১৮৯০ সালের ২৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
- সুনীতিকুমার বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ৩৮০-এর বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।
- এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো Origin and Development of the Bengali Language।
- তিনি ১৯৭৭ সালের ২৯ মে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

- ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।
- তাঁর গ্রন্থ Origin and Development of Bengali Language (ODBL)-এ এই সময়কালকে মুসলমান পূর্ব যুগ বা প্রাচীন যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- এই সময়ের প্রধান সাহিত্যিক নিদর্শন হলো চর্যাপদ।
- এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

- যদিও কিছু গবেষক, যেমন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে প্রাচীন যুগের বিস্তারকাল ৬৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দ হিসেবে ধরা হয়েছে। 
- তবু ড. সুনীতিকুমারের মতটি ৯৫০–১২০০ খ্রিষ্টাব্দকে অধিক স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট মনে করা হয়।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলাপিডিয়া। 

.
সুকুমার সেনের মতে চর্যাপদের অন্য নাম কী?
  1. চর্যাচর্যবিনিশ্চয়
  2. চর্যাগীতিকা
  3. চর্যাগীতিকোষ
  4. চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়
ব্যাখ্যা

চর্যাপদ:
- চর্যাপদ হলো প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।
- এটি মূলত ৬৫০–১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত পদ, গান বা গীতিকবিতার সংকলন।
- চর্যাপদ  সহজিয়া বৌদ্ধ সাধনাসংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
- চর্যাপদের ভাষা ‘সন্ধ্যা ভাষা’, অর্থাৎ রূপক ও সংকেতধর্মী।
- এতে ধর্মীয় ভাবধারা, লৌকিক জীবনের সরল চিত্র এবং নৈতিক শিক্ষা ফুটে ওঠে। 

- চর্যাপদের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৮২ সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের Sanskrit Buddhist Literature in Nepal বইয়ে।
- এটি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর dara আবিষ্কৃত হয় ১৯০৭ সালে নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে।
- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ১৯১৬ সালে এটি প্রকাশ করে, তখন প্রথম প্রকাশের নাম ছিল “হাজার বছরের পুরান বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা।”
- চর্যা অর্থ আচরণ।

- চর্যাপদের বিভিন্ন নাম আছে— চর্যাগীতিকা, চর্যাগীতিকোষ।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে চর্যাপদের নাম "চর্যাচর্যবিনিশ্চয়"- এর অর্থ 'কোনোটি আচরণীয় কোনোটি আচরণীয় নয়'।
- সুকুমার সেনের মতে চর্যাপদের নাম 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়- এর অর্থ 'আশ্চর্য জীবনাচরণ'।
- আধুনিক পণ্ডিতের মতে চর্যাপদের নাম- চর্যাগীতিকোষ। 

উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা। 

.
বাংলা ভাষায় রচিত কোনো কবির প্রথম একক গ্রন্থ কোনটি?
  1. চর্যাপদ
  2. কৃত্তিবাসী রামায়ণ
  3. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন 
  4. অন্নদামঙ্গল
ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন:
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের প্রথম কাব্যিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
- এটি বাংলা ভাষায় রচিত কোনো কবির প্রথম একক গ্রন্থ।
- এই কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস, যিনি মধ্যযুগের আদি কবি হিসেবে পরিচিত।
- কাব্যটির রচনার অবলম্বন হলো লোকসমাজে প্রচলিত রাধা–কৃষ্ণের প্রেমকাহিনিভিত্তিক গ্রাম্য গল্প।

- কাব্যটি ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আবিষ্কৃত হয়।
- এবং ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
- বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ এটি আবিষ্কার ও সম্পাদনা করেন।
- তাঁর সম্পাদনায় গ্রন্থটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়।
- পুঁথিটি আবিষ্কৃত হয় পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামে এক গৃহস্থ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে।

- আবিষ্কারের সময় পুঁথিটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত খণ্ডিত—প্রথম দুটি পাতা ও শেষের একটি পাতা অনুপস্থিত ছিল, মাঝের আরও কিছু পাতা বিলুপ্ত ছিল। এটি কবির স্বহস্তলিখিত নয়; বরং পরবর্তী এক বা একাধিক লিপিকরের লেখা। মোট ৩ জন লিপিকরের হাতের লেখা এতে শনাক্ত করা হয়েছে।

উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

.
মঙ্গলকাব্যের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? 
  1. লোকায়াত দেব-দেবীর পূজা প্রচার
  2. দেবতার কাহিনি বর্ণনা
  3. প্রেমকাহিনি বর্ণনা
  4. ধর্মীয় শিক্ষার প্রচার
ব্যাখ্যা

মঙ্গলকাব্য:
- মঙ্গলকাব্যকে মধ্যযুগের উপন্যাস বলা হয়।
- এটি মূলত কাহিনিকেন্দ্রিক ও আখ্যানপ্রধান সাহিত্য।
- প্রায় পাঁচশো বছর ধরে এই ধারার কাব্য রচিত হয়েছে—বিশেষত পনেরো শতকের শেষ ভাগ থেকে আঠারো শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত সময়কালজুড়ে।

- মঙ্গলকাব্যের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল লোকায়াত দেব-দেবী, বিশেষ করে দেবীর পূজা প্রচার ও গুণগান করা।
- এই কাব্যের দেব-দেবীরা মূলত অনার্য (অস্ট্রিক) জনগোষ্ঠীর দেবতা, যাদের পূজাপদ্ধতি আর্যদের আগমন সত্ত্বেও লোকসমাজে প্রচলিত ছিল।
- মঙ্গলকাব্যে মোট ৬২ জন কবির নাম পাওয়া যায়। 
- এই কাব্যে মনসা ও চণ্ডী দেবী সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

- মঙ্গলকাব্যের উদ্ভবের পেছনে ছিল একটি সুস্পষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আর্যদের আগমনের পর আর্য ও অনার্যদের সংস্পর্শ ঘটলেও অনার্যরা নিজেদের লৌকিক দেবতার পূজা চালু রাখে। পরবর্তীতে তুর্কি আক্রমণের ফলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও সমাজ সংকটে পড়ে, আর মুসলিম ধর্মের উদারতায় অনেকেই আকৃষ্ট হয়। এই পরিস্থিতিতে হিন্দু সমাজ ও মুসলিম সমাজের সংঘর্ষ ও প্রতিক্রিয়ার ফল হিসেবেই মঙ্গলকাব্যের উদ্ভব ঘটে—লোকদেবতার মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াসে।

- কাব্যরীতির দিক থেকে দেখা যায়, কবিরা সাধারণত স্বপ্নে দেবতার আদেশপ্রাপ্ত হয়ে কাব্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। কাহিনির শুরু হয় গণেশ, পিতা-মাতা বা রাজাদের স্তুতি দিয়ে। কাব্যের নায়ক সাধারণত কোনো স্বর্গভ্রষ্ট বা শাপভ্রষ্ট দেবতা, যিনি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে মর্ত্যে মানুষরূপে জন্মগ্রহণ করেন; তার স্ত্রীও সঙ্গে জন্ম নেন। মর্ত্যে তারা মানুষের মতো জীবনযাপন করেন এবং দেবীর পূজা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচার করেন। শেষে পূজা প্রতিষ্ঠিত হলে নায়ক-নায়িকা শাপমুক্ত হয়ে পুনরায় স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন।

উৎস:
বাংলাপিডিয়া;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা – সৌমিত্র শেখর।

.
চর্যাপদ প্রকাশের সময় এর মূল শিরোনাম কী ছিল?
  1. হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা
  2. চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়
  3. চর্যাগীতিকোষ
  4. ডাকার্ণব
ব্যাখ্যা

চর্যাপদ:
- চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন।
- এটি বৌদ্ধধর্মের সাধনার সাথে যুক্ত প্রাচীন সঙ্গীতের ঐতিহ্য। 

- চর্যাপদ আবিষ্কার এবং সংগ্রহের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ‘বিবিধার্থ’ পত্রিকার সম্পাদক রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর গ্রন্থ Sanskrit Buddhist Literature in Nepal-এ নেপালে সংগৃহীত বৌদ্ধধর্মের সাহিত্যের উল্লেখ করেন।
- পরে তার মৃত্যুর পর বাংলা, বিহার ও আসামের পুঁথি সংগ্রহের দায়িত্ব হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-এর ওপর পড়ে।
- এই কারণে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তিনবার নেপালে যান—প্রথম বার ১৮৯৭, দ্বিতীয় বার ১৯৯৮ এবং তৃতীয় বার ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে।
- নেপাল রাজদরবারের সংগ্রহশালা বা 'Royal Palace Museum of Nepal'-এ তিনি চর্যাপদের সঙ্গে ‘সহরপাদের দোহা’, ‘কৃষ্ণপাদের দোহা’ এবং ‘ডাকার্ণব’ নামক পুঁথি খুঁজে পান।
- তবে চর্যাপদ ছাড়া বাকি তিনটি পুঁথি বাংলা ভাষায় নয়; এগুলো বাংলা ভাষার পূর্ববর্তী স্তর, অপভ্রংশ বা বঙ্গকামরূপি ভাষায় রচিত।
- চর্যাপদের পদগুলি মূলত নওগাঁর পাহাড়পুর এবং সোমপুর বিহার এলাকায় রচিত।
- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ১৯১৬ সালে চর্যাপদ প্রকাশ করে।
- তখন চর্যাপদের প্রথম প্রকাশের নাম ছিল “হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা।”

- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদের কবি সংখ্যা ২৩ জন। 
- আর ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে পদকর্তার সংখ্যা ২৪ জন।

উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা। 

.
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন পুঁথিতে কবির ভণিতার সংখ্যা কত?
  1. ১৩টি
  2. ১৬১টি
  3. ৪০৯টি
  4. ৪১৮টি
ব্যাখ্যা

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কবির মোট ভণিতা সংখ্যা ৪০৯টি।
--------------------------- 
• শ্রীকৃষ্ণকীর্তন:
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন হলো বড়ু চণ্ডীদাস রচিত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও উৎকৃষ্ট আখ্যানকাব্য।
- প্রাক্‌-চৈতন্য যুগের (খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতক) প্রেক্ষাপটে রাধা–কৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত এই কাব্যটি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে নির্মিত একটি নাট্যগীতি।
- গ্রন্থটি ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ আবিষ্কার করেন।
- এবং পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে এটি প্রকাশিত হয়।

- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়।
- পুঁথির প্রথম ও শেষাংশ খণ্ডিত থাকায় কাব্যের নাম ও কবির পূর্ণ পরিচয় জানা যায়নি।
- গ্রন্থের ভেতরে কবির ভণিতা থাকলেও কাব্যের নামের উল্লেখ নেই।
- লোকশ্রুতি ও কৃষ্ণলীলা-ভিত্তিক বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে সম্পাদক এর নামকরণ করেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।
- তবে এই নাম যথার্থ নয় বলে অনেকের মত, কারণ কীর্তন বলতে ভক্তিসঙ্গীতে নাম-রূপ-গুণের সরব উচ্চারণ বোঝায়, অথচ এই কাব্যে সেই অর্থে কীর্তন অনুপস্থিত।
- কাব্যে ১২টি স্থানে ‘ধামালি’ শব্দের ব্যবহার থাকায় কেউ কেউ মনে করেন এর নাম ‘রাধাকৃষ্ণের ধামালি’ হলে অধিক উপযুক্ত হতো।
- পুঁথিতে প্রাপ্ত একটি চিরকুট অনুসারে কাব্যটির প্রকৃত নাম ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব্ব’ (শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ)।

- শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে মোট ৪১৮টি পদ রয়েছে (খণ্ডিতসহ)।
- এতে ১৬১টি সংস্কৃত শ্লোক সংযোজিত।
- পুঁথির মোট পাতা ২২৬টি, অর্থাৎ পৃষ্ঠা ৪৫২টি।
- এর মধ্যে মাঝের ৪৫টি পৃষ্ঠা বিলুপ্ত, আর প্রাপ্ত পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০৭টি।
- কাব্যে কবির ভণিতা সংখ্যা ৪০৯টি।

- গঠনগতভাবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি ১৩টি খণ্ডে বিভক্ত।
- খণ্ডগুলো হলো—
১. জন্ম খণ্ড
২. তাম্বুল খণ্ড
৩. দান খণ্ড
৪. নৌকা খণ্ড
৫. ভার খণ্ড
৬. ছত্র খণ্ড
৭. বৃন্দাবন খণ্ড
৮. কালিয়দমন খণ্ড
৯. যমুনা খণ্ড
১০. হার খণ্ড
১১. বাণ খণ্ড
১২. বংশী খণ্ড
১৩. বিরহ খণ্ড

উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

.
মঙ্গলকাব্যের পাঁচটি অংশের মধ্যে কোনটি দেবতার মহিমা ও কার্য বর্ণনা করে?
  1. স্বর্গ খণ্ড
  2. বন্দনা
  3. আত্মপরিচয়
  4. মর্ত্যখণ্ড
ব্যাখ্যা

মঙ্গলকাব্যের পাঁচটি অংশের মধ্যে দেবখণ্ড বা স্বর্গ খণ্ড অংশে মূলত স্বর্গীয় দেবতাদের মহিমা, কার্য, পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার পারস্পরিক সম্পর্ক, দেবতার শ্রেষ্ঠত্ব এবং স্বর্গীয় পটভূমিতে তাদের দ্বন্দ্ব ও চক্রান্ত বর্ণিত হয়। এখানে দেবতার পৃথিবীতে পূজা প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।
-------------------------- 
মঙ্গলকাব্য:
- মঙ্গলকাব্য হলো মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটি আখ্যানধর্মী কাব্য।
- এই কাব্যের মূল সাধারণত দেব-দেবী ও তাদের আখ্যানভাগ।
- এই যুগের কবিরা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে কাব্য রচনা শুরু করতেন এবং প্রায়শই সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ, পিতা-মাতা বা রাজাদের স্তুতি দিয়ে কাহিনি শুরু হত।
- মঙ্গলকাব্যের কাহিনিতে নায়করা সাধারণত স্বর্গভ্রষ্ট বা শাপভ্রষ্ট দেবতা, যারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে মর্ত্যে মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করেন।
- তাদের স্ত্রীও একইভাবে জন্ম নেন।
- মর্ত্যে তারা মানুষের মতো আচরণ করেন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে দেবীর পূজা প্রচারের পরে শাপমুক্ত হয়ে আবার স্বর্গে ফিরে যান।

- মঙ্গলকাব্য সমাজ ও ধর্মের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
- এতে দেখা যায় দুঃখের কাহিনি, বারমাসী গান, চৌতিশা, নারীর পতি নিন্দা, রন্ধনশিল্প ইত্যাদির বর্ণনা।
- কাব্যটি ছন্দপয়ার ও ত্রিপদী আকারের হয়, যা মূলত পাঁচালি ধরনের এবং মঞ্চে উপস্থাপন করা হত।

- একটি সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্যে সাধারণত পাঁচটি অংশ থাকে:
- বন্দনা,
- আত্মপরিচয়,
- দেবখণ্ড,
- মর্ত্যখণ্ড, এবং
- শ্রুতিফল।

- মঙ্গলকাব্যকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
- প্রথম হলো লৌকিক ধারা, যা খাঁটি মঙ্গলকাব্য হিসাবে পরিচিত। 
- এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত-
- মনসামঙ্গল,
- চণ্ডীমঙ্গল,
- কালিকামঙ্গল (বিদ্যাসুন্দর),
- সারদামঙ্গল,
- শিবমঙ্গল,
- শীতলামঙ্গল,
- রায়মঙ্গল,
- ষষ্ঠীমঙ্গল,
- সূর্যমঙ্গল।

- দ্বিতীয় হলো পৌরাণিক ধারা, যা বিশুদ্ধ পুরাণকেন্দ্রিক।
- এর মধ্যে রয়েছে- 
- অন্নদামঙ্গল,
- গৌরীমঙ্গল,
- ভবানীমঙ্গল,
- দুর্গামঙ্গল,
- কমলামঙ্গল,
- গঙ্গামঙ্গল,
- চণ্ডিকামঙ্গল।

- মঙ্গলকাব্যের প্রধান শাখা হলো তিনটি—
- মনসামঙ্গল, যা তুলনামূলকভাবে প্রাচীনতম,
- চণ্ডীমঙ্গল,
- এবং তুলনামূলকভাবে আধুনিক- অন্নদামঙ্গল। 
-------------------------- 
অন্যদিকে, 
- 'বন্দনা অংশ'- বিভিন্ন দেব-দেবী, গুরু এবং সম্মানীয় ব্যক্তিদের স্তুতি বা অর্চনাকে কেন্দ্র করে রচিত।

- ‘আত্মপরিচয়’ অংশে কবি নিজের পরিচয়, ভৌগোলিক অবস্থান, বংশপরিচয়, এবং স্বপ্নাদেশ বা দৈবনির্দেশে গ্রন্থ রচনার কারণ বর্ণনা করেন।

- মঙ্গলকাব্যের ‘মর্ত্যখণ্ড’ (বা নরখণ্ড/মানুষের কাহিনী) অংশটি মূলত লৌকিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার এবং মর্ত্যলোকে তাঁদের পূজা প্রতিষ্ঠা করার কাহিনী নিয়ে রচিত। এই অংশে বর্ণিত হয় কিভাবে লৌকিক দেব-দেবী মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করে পূজা আদায় করেন।

উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

.
মনসামঙ্গল কাব্যকে আর কী নামে অভিহিত করা হয়?
  1. চণ্ডিকামঙ্গল 
  2. সূর্যমঙ্গল 
  3. গৌরীমঙ্গল
  4. কেতকামঙ্গল
ব্যাখ্যা

মনসামঙ্গল:
- মনসামঙ্গল হলো সেই কাব্যগুলো যা মূলত সাপের দেবী মনসাকে কেন্দ্র করে রচিত।
- মনসার অপর নাম কেতকা বা পদ্মা।
- তাই মনসামঙ্গলের অন্য নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় কেতকামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ।
- মনসামঙ্গল কাব্য মঙ্গলকাব্যের আদি ও প্রাচীনতম ধারা হিসেবে পরিচিত।
- এর কাহিনি পূর্ববঙ্গের বনজঙ্গল, নদী, খাল ও বিলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

- ‘মনসামঙ্গল কাব্য’-এর আদি কবি কানহরিদত্ত হলেও শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃত বিজয়গুপ্ত।
- বিজয়গুপ্ত ‘পদ্মপুরাণ’ নামে এই কাব্য রচনা করেন।
- এখানে দেবী মনসার জন্ম ও চাঁদ সওদাগরের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
- এছাড়া এটি সর্পদেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠা, তাঁর মাহাত্ম্য, শক্তি ও মানবজীবনে তাঁর প্রভাবকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে।

- কাহিনীর মূল চরিত্র চাঁদ সওদাগর।
- তিনি প্রথমে মনসাকে তুচ্ছ করলেও পরে দেবীর অলৌকিক শক্তি স্বীকার করে নেন।
- এই বিরোধ, সংকট ও গ্রহণের মধ্য দিয়েই কাব্যের গল্প এগোতে থাকে।
- মনসামঙ্গলে কেবল পৌরাণিক আখ্যানই নয়, সমাজবাস্তবতার দিকও প্রকাশ পেয়েছে।
- চাঁদ ও মনসার দ্বন্দ্বে আর্য–অনার্য সংঘাত, দেব–মানব বিরোধ, এবং সমাজের শ্রেণী-বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছিল।

- এই কাব্যের প্রধান চরিত্র:
• দেবী মনসা,
• চাঁদ সওদাগর,
• বেহুলা,
• লক্ষিন্দর,
• সনকা ও
• নেতাইধোপানি।

- মধ্যযুগের সাহিত্যে চাঁদ সওদাগর সর্বাধিক প্রতিবাদী পুরুষ চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। 
- আর বেহুলা সেই যুগের সর্বাধিক প্রতিপ্রাণা নারী চরিত্র— যিনি স্বামীর প্রাণ রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। 

উৎস: 
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – মাহবুবুল আলম; 
লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী – হুমায়ুন আজাদ। 

.
“পিপিড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে কাহার ষোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে।” উক্তিটি মঙ্গলকাব্যের কোন শাখা থেকে নেওয়া হয়েছে?
  1. মনসামঙ্গল
  2. চণ্ডীমঙ্গল
  3. অন্নদামঙ্গল
  4. কালিকামঙ্গল
ব্যাখ্যা

“পিপিড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে কাহার ষোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে।” - উক্তিটি মঙ্গলকাব্যের চণ্ডীমঙ্গল শাখার কালকেতু-ফুল্লরা উপাখ্যান থেকে নেওয়া।
- উক্তিটি ফুল্লরা বলেছে তার স্বামী কালকেতুকে
--------------------------------
• চণ্ডীমঙ্গলের প্রথম খণ্ড: কালকেতু-ফুল্লরা উপাখ্যান:
- চণ্ডীমঙ্গল কাব্য মূলত দুটি প্রধান কাহিনির সমন্বয়ে গঠিত—
• ব্যাধ কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনি, যা ‘আখেটিক খণ্ড’ নামে পরিচিত,
• এবং বণিক ধনপতি সদাগর ও খুল্লনার কাহিনি, যা ‘বণিক খণ্ড’ নামে অভিহিত।

- চণ্ডীমঙ্গলের প্রথম খণ্ডে দেবী চণ্ডীকে কেন্দ্র করে কাহিনি রচিত।
- নায়ক কালকেতু এবং নায়িকা ফুল্লরা।
- খল চরিত্র হিসেবে রয়েছে ভাঁড়ু-দত্ত ও মুরারী শীল।

- কাহিনী:
- কাহিনির সূচনা হয় শিবভক্ত নীলাম্বর শাপগ্রস্ত হয়ে মর্ত্যে আগমনের মাধ্যমে। নীলাম্বর কলিঙ্গ জনপদে কালকেতু নামে জন্মায় এবং তাঁর স্ত্রী ছায়া ফুল্লরা নামে জন্মগ্রহণ করে। মর্ত্যে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। কালকেতু বনের পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে, কিন্তু তার অত্যাচারে পশুরা দেবী চণ্ডীর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। চণ্ডী গুইসাপরূপে কালকেতুর সামনে উপস্থিত হয়ে শিকার প্রতিরোধ করে। কালকেতু শিকার না পেয়ে গুইসাপরূপী চণ্ডীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে হাটে চলে যায়। 
ফুল্লরা বাসায় ফিরে দেখে চণ্ডী সুন্দরী নারীমূর্তি ধারণ করে বসে আছে। এটি দেখে ফুল্লরা রেগে যায় এবং চোখ লাল হয়ে প্রতিবাদ করে বলে: “পিপিড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে কাহার ষোড়শী কন্যা আনিয়াছ ঘরে।”
পরে দেবী স্বরূপে ফিরে এসে ফুল্লরাকে পূজা প্রচারের প্রলোভন দেখান এবং কালকেতুকে দুটি উপহার দেন—মানিক অঙ্গুরীয় ও সাত ঘড়া সোনার মহর, যা বিক্রি করে গুজরাট বন কেটে নগর গঠন করতে নির্দেশ দেয়া হয়। কালকেতু নগর তৈরি করেন, কিন্তু লোক না থাকায় দেবী বন্যা প্রেরণ করে যাতে লোক আসে এবং বিনিময়ে চণ্ডীর পূজা করা হয়। কিছু মুসলমানও আসে, তবে তাদের পূজা বাধ্যতামূলক নয়। এরপর ভাড়-দত্ত নামে প্রতারক লোক আসে, যার কারণে কলিঙ্গ রাজা কালকেতুকে পরাজিত করে। দেবীর স্বপ্নাদেশে কালকেতু পুনরায় বাড়ি পৌঁছায় এবং অবশেষে সকলেই চণ্ডীর ক্ষমতা বুঝে তার পূজা প্রচার করতে থাকে।

উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

১০.
চর্যাপদের কোন কোন পদ সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়নি?
  1. ২৩, ২৫ ও ৪৮ নং পদ 
  2. ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদ 
  3. ২৫, ২৬ ও ৪৮ নং পদ 
  4. ২৩, ২৪ ও ৪৮ নং পদ 
ব্যাখ্যা

চর্যাপদ:
- চর্যাপদ মূলত কয়েকটি প্রাচীন কবিতা বা গানের একটি সংকলন। 
- চর্যাপদ সান্ধ্য ভাষায় রচিত।
- সান্ধ্য ভাষা বলতে সেই ভাষাকে বোঝানো হয় যার কোনো স্থির বা নির্দিষ্ট রূপ নেই এবং যার অর্থ একাধিক স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়—ঠিক আলো ও আঁধারের সংমিশ্রণের মতো। এই দ্ব্যর্থবোধক ও রহস্যময় বৈশিষ্ট্যের কারণেই পণ্ডিতরা একে ‘সন্ধ্যা’ বা ‘সান্ধ্য’ ভাষা নামে অভিহিত করেছেন।
- চর্যাপদ বিভিন্ন নামে পরিচিত;
- যেমন- “আশ্চর্য চর্যাচয়”, “চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়”, “চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়” এবং “চর্যাগীতিকোষ”

- চর্যাপদের মোট পদসংখ্যা মূলত ৫০টি।
- তবে সুকুমার সেন মনে করেন  চর্যাপদের মোট পদসংখ্যা ৫১টি।
- বর্তমানে উদ্ধারকৃত পদসংখ্যা সাড়ে ছেচল্লিশ (৪৬.৫)।
- এবং অনুদ্ধারকৃত বা হারানো পদ সংখ্যা সাড়ে তিন (৩.৫)। 

- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদের কবি সংখ্যা ২৩ জন। 
- আর ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে পদকর্তার সংখ্যা ২৪ জন।

- চর্যাপদের মধ্যে ২৪, ২৫ ও ৪৮ নম্বর পদ সম্পূর্ণরূপে পাওয়া যায়নি।
- এর মধ্যে ২৪ নম্বর পদের রচয়িতা কাহ্নপা।
- ২৫ নম্বর পদের রচয়িতা তন্ত্রীপা।
- এবং ৪৮ নম্বর পদের রচয়িতা কুক্কুরীপা।
- এছাড়া ভুসুকুপা রচিত ২৩ নম্বর পদটি খণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া গেছে—এই পদের মোট ৬টি পঙক্তি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট ৪টি পঙক্তি আর পাওয়া যায়নি।

- চর্যাপদে বিভিন্ন কবি কতগুলি পদ রচনা করেছেন তা নিম্নরূপ:
- সবচেয়ে বেশি পদ রচনা করেছেন কাহ্নপা, মোট ১৩টি (পাওয়া গেছে ১২টি)।
- দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ রচনা করেছেন ভুসুকুপা, মোট ৮টি।
- তৃতীয় স্থানে সরহপা ৪টি পদ রচনা করেছেন।
- লুইপা, শান্তিপা, এবং শবরপা প্রতিজন ২টি করে পদ রচনা করেছেন।
- অন্য বাকি পদকর্তারা প্রত্যেকে ১টি করে পদ রচনা করেছেন।

উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা। 

১১.
“হাভাতে যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়” উক্তিটি অন্নদামঙ্গল কাব্যের কোন চরিত্রের বক্তব্য?
  1. লক্ষ্মী
  2. শিব
  3. সীতা
  4. উমা 
ব্যাখ্যা

- “হাভাতে যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়” উক্তিটি মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত অন্নদামঙ্গল কাব্য থেকে নেওয়া।
- এটি মূলত একটি প্রবাদ বাক্য,লক্ষ্মী শিবকে উদ্দেশ্য করে এই উক্তি করেছে। 
- এখানে দেবী লক্ষ্মী শিবকে জানান যে তাদের ঘরে কোনো অন্ন নেই এবং তিনি নিজেই ‘লক্ষ্মীছাড়া’ হয়ে গেছেন।
- এই আক্ষেপের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, যার ভাগ্যে অন্ন বা সমৃদ্ধি নেই, সে যেদিকে হাত দেয়, সব কিছুতেই অসফলতা বা ধ্বংস আসে। 
-------------------
অন্নদামঙ্গল:
- অন্নদামঙ্গল মধ্যযুগের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্য, যা আনুমানিক ১৭৫২-৫৩ সালে রচিত হয়।
- এর রচয়িতা হলেন মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
- প্রথম মুদ্রণ করা হয় ১৮১৬ সালে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের মাধ্যমে।
- কাব্যটি মূলত দেবী অন্নদার পূজা, মহিমা এবং আখ্যান প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত।
- ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যটি ছন্দ ও অলঙ্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুদক্ষভাবে রচিত।
- সমালোচক অধ্যাপক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য এবং সমগ্র বাংলা সাহিত্যের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

- কাব্যটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:
• প্রথম খণ্ড শিবায়ন অন্নদামঙ্গল,
• দ্বিতীয় খণ্ড বিদ্যাসুন্দর কালিকা মঙ্গল এবং
• তৃতীয় খণ্ড মানসিংহ অন্নদামঙ্গল।

• প্রথম খণ্ডে সীতার দেহত্যাগ, উমারূপে জন্মগ্রহণ, শিবের সঙ্গে বিবাহ, অন্নপূর্ণার মূর্তিধারণ এবং কাশীপ্রতিষ্ঠার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

• দ্বিতীয় খণ্ডে বিদ্যাসুন্দরের প্রেমকাহিনি প্রকাশিত হয়েছে।

• তৃতীয় খণ্ডে মানসিংহের যশোর অভিযান, রাজা প্রতাপাদিত্যের পরাজয় এবং ভবানন্দের দিল্লি যাত্রার বর্ণনা রয়েছে।

- অন্নদামঙ্গল কাব্যের বিখ্যাত পঙক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”
•“মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।”
• “হাভাতে যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়।”
• “নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?”
• “বড়র পিরীতি বালির বাঁধ! ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষনেকে চাঁদ।”

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর,
বাংলাপিডিয়া।

১২.
বৈষ্ণব পদাবলির প্রথম বাঙালি কবি কে?
  1.  চণ্ডীদাস
  2. জয়দেব
  3. বিদ্যাপতি
  4. মুকুন্দরাম চক্রবর্তী 
ব্যাখ্যা

বৈষ্ণব পদাবলি:
- মধ্যযুগে বৈষ্ণব ধর্ম, বৈষ্ণবশাস্ত্র এবং রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের আড়ালে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনলীলাকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, তাকে বৈষ্ণব সাহিত্য বলা হয়।

- বৈষ্ণব সাহিত্য মূলত তিন প্রকার—
- পদাবলি,
- জীবনীকাব্য,
- এবং বৈষ্ণবশাস্ত্র।

- পদাবলি হলো রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ও জীবাত্মা–পরমাত্মার মিলনলীলার আড়ালে রচিত গীতিকাব্য, যা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
- বাঙালি কবি জয়দেব-কে বৈষ্ণব পদাবলির প্রথম পদকর্তা বা আদিকবি বলা হয়।
- তাঁর রচিত গীতগোবিন্দম্ কাব্যে রাধা–কৃষ্ণের প্রেম ও ভক্তির রূপ চিত্রিত হলেও এটি বাংলা নয়, সংস্কৃত ভাষায় রচিত।
- তবু এটিকেই আদি বৈষ্ণব পদাবলির নিদর্শন ধরা হয়।
- পরবর্তীতে অবাঙালি কবি বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় প্রথম বৈষ্ণব পদ রচনা করেন।
- তাই তাঁকে ব্রজবুলি ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির আদিকবি বলা হয়। 
- বাংলা ভাষায় প্রথম বৈষ্ণব পদাবলি রচনা করেন চণ্ডীদাস—যার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় এই ধারার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

- বৈষ্ণব পদাবলিতে মোট পাঁচটি রসের প্রকাশ দেখা যায়—
- শান্তরস,
- দাস্যরস,
- সখ্যরস,
- বাৎসল্যরস,
- ও মধুররস।
- এই রসসমূহের সমন্বয়েই বৈষ্ণব পদাবলি ভক্তি ও প্রেমের এক অনন্য সাহিত্যিক রূপ লাভ করেছে।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড. মাহবুবুল আলম।

১৩.
রাজা শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে কোন উপাধি দিয়েছিলেন?
  1. কঙ্কণকবি 
  2. কবি কণ্ঠহার
  3. কবি কণ্ঠমণি
  4. কাব্যস্বর
ব্যাখ্যা

বিদ্যাপতি:
- বিদ্যাপতি (১৩৭৪–১৪৬০) ছিলেন প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি এবং পদসঙ্গীত ধারার রূপকার।
- তিনি মিথিলার সীতামারী মহকুমার বিসফি গ্রামে শৈব ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- বিদ্যাপতি ছিলেন পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত কবি এবং বৈষ্ণব পদাবলির জনক।
- তিনি মিথিলার রাজা শিবসিংহের সভাকবি ছিলেন। 
- রাজা তাঁকে ‘কবি কণ্ঠহার’ উপাধি প্রদান করেছিলেন।
- বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষার প্রবর্তক এবং মৈথিলি কোকিল হিসেবে খ্যাত।
- এছাড়া তাঁকে অভিনব জয়দেব হিসেবেও সম্বোধন করা হয়।

- বিদ্যাপতি মৈথিলী, অবহট্ঠ এবং সংস্কৃত ভাষায় বহু গ্রন্থ ও পদ রচনা করেছেন।
- তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ব্রজবুলিতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ভিত্তিক বৈষ্ণব পদাবলি।
- মৈথিলী ভাষার এই পদসঙ্গীত পরে বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ভাষা ও কীর্তন গায়কদের প্রভাবে ব্রজবুলি নামে পরিচিত হয়।
- এতে প্রধানত বাংলা ও মৈথিলীর মিশ্রণ, সঙ্গে কিছু হিন্দি শব্দও আছে।
- উনিশ শতক পর্যন্ত এই ভাষায় বৈষ্ণব পদ রচিত হয়।
- এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীও এ ভাষায় রচনা করেছেন।
- চৈতন্যদেব নিজে বিদ্যাপতির পদ শুনতেন, যার কারণে পদগুলোর মর্যাদা ও বিস্তার বৃদ্ধি পায়।

- বিদ্যাপতি আখ্যায়িকা, ইতিহাস, ভূগোল, ধর্ম ও ন্যায়শাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রন্থও রচনা করেছেন।
- তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:
- পুরুষপরীক্ষা (নীতিশিক্ষা),
- লিখনাবলী (পত্র লেখার রীতি),
- কীর্ত্তিলতা (ইতিহাস),
- ভূ-পরিক্রমা (ভূগোল),
- দানবাক্যাবলী,
- দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী,
- শৈবসর্বস্বসার,
- বিভাগসার,
- গঙ্গাবাক্যাবলী,
- কীর্তিপতাকা ইত্যাদি।

উৎস:
বাংলাপিডিয়া;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।

১৪.
চৈতন্য-চরিতামৃত গ্রন্থটি কে রচনা করেছিলেন?
  1. বৃন্দাবনদাস
  2. লোচনদাস
  3. কৃষ্ণদাস কবিরাজ
  4. জয়ানন্দ
ব্যাখ্যা

চৈতন্যদেবের জীবন ও তার সাহিত্য:
- চৈতন্যদেব ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন।
- এবং ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে পুরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
- তাঁর নামানুসারে একটি সাহিত্য যুগ সৃষ্টি হয়, যা চৈতন্য যুগ নামে পরিচিত।
- এই যুগ চলেছিল ১৫০০ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

- চৈতন্যদেব ও তাঁর শিষ্যদের জীবনকাহিনি অবলম্বন করে যে সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে জীবনীকাব্য বলা হয়।
- এই জীবনীকাব্যের মধ্যে বাংলায় প্রথম কাব্য হলো- বৃন্দাবনদাসের ‘শ্রীচৈতন্য-ভাগবত’। 
- এরপর লোচনদাসের ‘চৈতন্যমঙ্গল’; 
- জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’;
- এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্য-চরিতামৃত’ রচিত হয়।
- বিশেষ করে ‘চৈতন্য-চরিতামৃত’ মনন, দর্শন, তত্ত্বজ্ঞান ও রসবোধের সমন্বয়ের জন্য বৈষ্ণব সমাজে উপনিষদের মর্যাদা পেয়েছে।

- চৈতন্যদেব জীবিতকালে তাঁর পাশে যারা ছিলেন, তাদেরকে ষড়গোস্বামী বলা হয়।
- এদের মধ্যে রূপ গোস্বামী, জীব গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, গোপালহট্ট, রঘুনাথ দাস অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
- এছাড়া, চৈতন্যদেবের জীবনকাহিনি অবলম্বন করে যে দৃষ্টি ও অভিজ্ঞতা সাহিত্য হিসেবে রচিত হয়েছে, তাকে কড়চা বা দিনলিপি বলা হয়।- মূল কড়চাগুলো হলো:
- জীবনীকাব্য (জীবনকাহিনি),
- কড়চা (দিনলিপি),
- এবং ষড়গোস্বামীদের উপস্থিতি।
- এগুলো বৈষ্ণব সাহিত্য ও চৈতন্যদেবের জীবনচর্চার কেন্দ্রবিন্দু।

উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

১৫.
চণ্ডীদাস কোন দেবীর ভক্ত ছিলেন?
  1. দুর্গা
  2. বাশুলীদেবী
  3. লক্ষ্মী
  4. সরস্বতী
ব্যাখ্যা

চণ্ডীদাস:
- চণ্ডীদাস চতুদর্শ শতকের শেষভাগে বীরভূমের নান্নুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
- তিনি বাংলা পদাবলির জনক। 
- তিনি চৈতন্য পূর্ববর্তী সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি ছিলেন।
- চণ্ডীদাস বাশুলীদেবীর ভক্ত ছিলেন।
- তিনি পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি ও দুঃখের কবি হিসেবে পরিচিত।
- চণ্ডীদাসের পদাবলিতে প্রেম, বিচ্ছেদ, বেদনা ও যন্ত্রণার সুন্দর প্রকাশ থাকায় বাংলা সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে “দুঃখের কবি” আখ্যা দিয়েছেন।
- বাংলা পদাবলির যে সকল পদ বাঙালির হৃদয় স্পর্শ করেছে, তার অধিকাংশই চণ্ডীদাসের লেখা।
- তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে রাধা–কৃষ্ণের প্রেম ও আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 
- চণ্ডীদাসের রচনা বাংলা বৈষ্ণব পদাবলির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য হয়।

- তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু উক্তি হলো:
• “সই, মেন ধরিব হিয়া আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমার আঙিনা দিয়া,”
• “বহুদিন পরে বধূয়া এলে। দেখা না হইতে পরান গেলে,”
• “বধূ কী আর বলিব আমি মরণে জীবনে জনমে জনমে প্রাণনাথ হৈও তুমি,”
• “আমার পরান যেমতি করিছে তেমতি হউক সে,”
• “সই কে বা শুনাইলো শ্যাম নাম,”
• “শ্যামের পিরিতি চন্দনের রীতি ঘষিতে সৌরভময়।”

 - তাঁর জাত-পাতমুক্ত সমাজে প্রথম মানবতার বানী-
"সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই" 

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলাপিডিয়া।

১৬.
বাংলায় রামায়ণের প্রথম অনুবাদক কে? 
  1. কৃত্তিবাস ওঝা
  2. বাল্মীকি
  3. চন্দ্রাবতী
  4. গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ
ব্যাখ্যা

রামায়ণ:
- রামায়ণ সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন মহাকাব্য।
- এটি  বিশ্বের চারটি জাত মহাকাব্যের অন্যতম।
- ‘রামায়ণ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ- রামের যাত্রা। 

- মহাকাব্যটির রচয়িতা বাল্মীকি।
- তাঁর পূর্বনাম রত্নকার, যিনি একসময় দস্যু ছিলেন।
- ‘বাল্মীকি’ শব্দের অর্থ উইপোকার ঢিবি। 

- রামায়ণ ৩২ অক্ষরবিশিষ্ট অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত;
- এতে রয়েছে ৫০০টি সর্গ, ২৪,০০০ শ্লোক ও ৪৮,০০০ পঙক্তি।
- গ্রন্থটি সাতটি কাণ্ডে বিভক্ত—
- আদিকাণ্ড,
- অযোধ্যাকাণ্ড,
- অরণ্যকাণ্ড,
- কিষ্কিন্ধাকাণ্ড,
- সুন্দরকাণ্ড,
- যুদ্ধ/লঙ্কাকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড। 

- বাংলা সাহিত্যে রামায়ণের প্রথম অনুবাদক পঞ্চদশ শতকের কবি কৃত্তিবাস ওঝা
- তিনি গিয়াস উদ্দীন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ করেন।
- রামায়ণের প্রথম নারী অনুবাদক চন্দ্রাবতী।
- তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি; তাঁর পিতা কবি দ্বিজ বংশীদাস।

- রামায়ণের প্রধান চরিত্র রাম, সীতা, লক্ষ্মণ, দশরথ, রাবণ, বিভীষণ ও হনুমান।
- বিষ্ণুর অবতার রামের দ্বারা রাক্ষস রাবণবধকে কেন্দ্র করে এই মহাকাব্যে মানবজীবনের কর্তব্যবোধ, ধর্মবোধ, নৈতিকতা, প্রেম, ত্যাগ ও অস্তিত্বের জটিল প্রশ্ন গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা ড. সৌমিত্র শেখর ও বাংলাপিডিয়া।

১৭.
পরাগলী মহাভারত’ নামে পরিচিত অনুবাদটি কার রচনা?
  1. শ্রীকর নন্দী
  2. কবীন্দ্র পরশ্বের
  3. কাশীরাম দাস
  4. দ্বিজ মাধব
ব্যাখ্যা

• মহাভারত:
- মহাভারত সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রাচীন মহাকাব্যগুলোর অন্যতম।
- এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃত।
- ‘মহাভারত’ শব্দের অর্থ—ভারত বংশের উপাখ্যান।

- এই মহাকাব্য রচনা করেন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস (ব্যাসদেব)।
- মহাভারতে মোট ১৮টি পর্ব বা খণ্ড রয়েছে।
- এতে প্রায় ৮৫,০০০ শ্লোক এবং প্রায় ১,৭০,০০০ চরণ বা পঙক্তি সংকলিত হয়েছে।
- কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে কেন্দ্র করে কৌরব ও পাণ্ডবদের বংশকথা, ধর্ম, নীতি, রাজনীতি এবং মানবজীবনের জটিলতা এই মহাকাব্যের মূল বিষয়বস্তু।
- যুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল ১৮ দিন। 

- বাংলা ভাষায় মহাভারতের প্রথম অনুবাদ করেন কবীন্দ্র পরশ্বের।
- তিনি পরাগল খাঁ-এর আদেশে মহাভারতের সারসংক্ষেপ অনুবাদ করেন; তাই এ অনুবাদ ‘পরাগলী মহাভারত’ নামে পরিচিত।
- পরে শ্রীকর নন্দী ছুটি খানের আদেশে মহাভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন, যা ‘ছুটি খানি মহাভারত’ নামে খ্যাত।
- বাংলা সাহিত্যে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে কাশীরাম দাস সর্বাধিক স্বীকৃত।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর;
বাংলাপিডিয়া।

১৮.
নিচের কোনটি আলাওল রচিত নীতিকাব্য? 
  1. পদ্মাবতী
  2. সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী
  3. সিকান্দরনামা
  4. তোহফা 
ব্যাখ্যা

সৈয়দ আলাওল:
- কবি সৈয়দ আলাওল মধ্যযুগের একজন কিংবদন্তি মুসলিম কবি।
- তিনি বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক গ্রন্থপ্রণেতা।
- সৈয়দ আলাওল ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের মুসলিম কবিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। 
- তাঁর পাণ্ডিত্য ও সাহিত্যকর্ম শতাব্দী ধরে পাঠক ও গবেষককে মুগ্ধ করেছে।
- তিনি বহুভাষাবিদ ও পণ্ডিত ছিলেন।
- যোগশাস্ত্র, আরবি, ফারসি, মৈথিলী, প্রাকৃতপৈঙ্গল, ব্রজবুলি, বাংলা ও সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
- অনুবাদ ও নীতিকাব্যচর্চায়ও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

- আলাওল প্রায় ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
- জন্মস্থান নিয়ে কিছু মতবিরোধ থাকলেও অধিকাংশ পণ্ডিত ফরিদপুর জেলার ফতেয়াবাদ পরগনার জামালপুর গ্রাম উল্লেখ করেন।
- আবার কিছু পণ্ডিতের মতে তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীতে।
- তিনি আরাকান রাজসভার রাজদেহরক্ষী অশ্বারোহীর পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
- তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য পদ্মাবতী, যা হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবৎ কাব্যের অনুবাদ।

- তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে- 
- ‘পদ্মাবতী’,
- ‘সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী’,
- ‘সপ্তপয়কর’, 
- ‘সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’,
- ‘সিকান্দরনামা’,
- ‘তোহফা’ (নীতিকাব্য),
- ‘রাগতালনামা’ (সঙ্গীতবিষয়ক)।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলাপিডিয়া

১৯.
নিচের কোনটি নাথ সাহিত্যের দৃষ্টান্ত?
  1. গোপীচন্দ্রের সন্যাস
  2. গোরক্ষবিজয়
  3. ময়নামতির গান
  4. সবগুলো
ব্যাখ্যা

নাথ সাহিত্য:
- নাথ সাহিত্য মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যধারা।
- এটি নাথ ধর্মের আধ্যাত্মিকতা ও দেহের ওপর আত্মার জয়ের বিষয়কে তুলে ধরে।
- নাথ ধর্ম কৌদ্ধ ও শৈব ধর্মের মিশ্রণে সৃষ্টি হয় এবং এর আদি নাথ হলো শিব।
- দশম–একাদশ শতকে নাথ আচার্যদের আবির্ভাবের সঙ্গে নাথ সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। 

- নাথ সাহিত্য প্রথম রংপুরে আবিষ্কার হয়।
- ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে জর্জ গ্রিয়ারসন স্থানীয় গায়কের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন।
- এবং পরবর্তীতে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ‘মানিকরাজার গান’ নামে প্রকাশিত হয়।
- ১৯০৭–১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে নীলফামারীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্য তিনজন যোগীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ গান ও কাহিনি সংগ্রহ করেন।
- ১৯২২–১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রাথমিক খণ্ডগুলো প্রকাশিত হয়।

- নাথ সাহিত্যের প্রধান রচয়িতা ছিলেন শেখ ফয়জুল্লাহ।
- এছাড়াও গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস রচনাও নাথ সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

- নাথ সাহিত্য দুই প্রকারে বিভক্ত—
- মীননাথ ও তার শিষ্য গোরক্ষনাথের কাহিনি;
- এবং রাজা গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস। 

• কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাথ সাহিত্য হলো:
- 'গোরাক্ষ বিজয়' এর রচয়িতা শেখ ফয়জুল্লাহ।
- 'গোপীচন্দ্রের সন্যাস' এর রচয়িতা শুকুর মাহমুদ।
- 'মীনচেতন' এর রচয়িতা শ্যামাদাস সেন।
- 'ময়নামতির গান' এর রচয়িতা ভবানী দাস।
- 'গোর্খবিজয়' এর রচয়িতা ভীমসেন রায়।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলাপিডিয়া।

২০.
বাউল মতের উদ্ভব ঘটে কত শতাব্দীতে? 
  1. ষোড়শ শতাব্দী
  2. সপ্তদশ শতাব্দী
  3. ঊনবিংশ শতাব্দী
  4. বিংশ শতাব্দী
ব্যাখ্যা

বাউল পদাবলি:
- বাউল পদাবলি হলো গান বা পদাবলির মাধ্যমে বাউলদের আধ্যাত্মিকতা, জীবনদর্শন ও সাধনার প্রকাশ।
- বাউল গান বাংলা লোকসাহিত্যের অংশ। 
- বাউল মতের উদ্ভব ঘটে সপ্তদশ শতাব্দীতে।
- এই মত ঊনবিংশ শতাব্দীতে জনপ্রিয় হয়।
- বিশেষ করে লালন শাহ সাধারণ মানুষের কাছে বাউল গান পৌঁছে দেন এবং এটি জনপ্রিয় করেন।
- বাউল গান বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ইউনেস্কো’র ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এ অন্তর্ভুক্ত; ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে।
- লালন শাহকে বাউল সম্রাট বলা হয়। 
- তাঁর দর্শন ও গানের প্রভাব বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু শিল্পী ও সাধকের ওপর পড়েছে।

• গুরুত্বপূর্ণ বাউল সাধক:
- সিরাজ শাহ, 
- লালন শাহ, 
- পাঞ্জু শাহ, 
- শাহ আব্দুল করীম, 

• লালন ফকিরের উল্লেখযোগ্য কিছু গান:
- খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, আমি অপার হয়ে বসে আছি ও হে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়।
- জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা, সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সবি দেখি তা না-না-না।
- সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, লালন কয় জাতের কী রূপ আমি দেখলাম না দুই নজরে।
- সময় গেলে সাধন হবে না, দিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না।
- গুরু গো… ও ও ও বেধ বিধির পথ শাস্ত্র কানা, আর এক কানা মন আমার এসব দেখি কানার হাট বাজার।
- বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথা এক পড়শি বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে।

উৎস:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা;
বাংলাপিডিয়া।

২১.
শাক্ত পদাবলির প্রধান পদকর্তা কে?
  1. বিদ্যাপতি
  2. চণ্ডীদাস
  3. রামপ্রসাদ সেন
  4. লালন শাহ
ব্যাখ্যা

শাক্ত পদাবলি:
- শাক্ত পদাবলি বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা, যা অষ্টাদশ শতাব্দী ও পরবর্তী সময়ে রচিত।
- এটি শক্তির আরাধ্যা দেবী—দুর্গা বা কালী—কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে।
- বৈষ্ণব পদাবলির মতো এখানে শৃঙ্গার রস নয়; বরং প্রধান রস হলো বৎসল্য এবং প্রতিবৎসল্য।
- শাক্ত দেবীর দশ রূপের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রূপ হলো কালী।
- শাক্ত পদাবলির মোট ১২টি পর্যায় রয়েছে।
- শাক্ত পদাবলি মধ্যযুগের সর্বশেষ সাহিত্য সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

- এই ধারার প্রধান পদকর্তা রামপ্রসাদ সেন।
- রামপ্রসাদ সেন  বাংলা ভক্তিগীতির, বিশেষত শ্যামাসঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ রূপকার, সাধককবি, গায়ক। 
- তিনি ভক্তের আকুতি পর্যায়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং তাঁর প্রায় ৩০০টি পদ রয়েছে।
- তাঁর কাব্যপ্রভুত্বে মুগ্ধ হয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি প্রদান করেছিলেন।

- শাক্ত পদাবলির দুটি প্রধান রূপ হলো—
• উমা বা পার্বতী বা বিজয়া, যা উমাসংগীত বা আগমনী নামে পরিচিত।
- এবং এর প্রধান রস হলো বৎসল্য। 

• কালী বা শ্যামা, যা মাতৃরূপী শক্তি কালী বা শ্যামাকে কেন্দ্র করে রচিত।
- এবং এর প্রধান রস প্রতিবৎসল্য বা মাতৃভক্তি।
----------------------------
অন্যদিকে,
- বিদ্যাপতি – বৈষ্ণব পদাবলির আদি কবি।
- চণ্ডীদাস – বাংলা পদাবলির জনক এবং চৈতন্য পূর্ববর্তী জনপ্রিয় কবি।
- লালন শাহ – বাউল পদাবলির সর্বাধিক প্রভাবশালী সাধক।

উৎস: বাংলাপিডিয়া। 

২২.
লোকসাহিত্যকে ‘জনপদের হৃদয়-কলরব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন কে?
  1. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
  2. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
  3. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
  4. কাজী নজরুল ইসলাম
ব্যাখ্যা

লোকসাহিত্য:
- লোকসাহিত্য হলো মূলত মৌখিক ধারায় বিকশিত এক ধরনের সাহিত্য।
- এই সাহিত্য অতীতের ঐতিহ্য ও বর্তমান জীবনের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।
- এটি লোকসংস্কৃতির একটি জীবন্ত শাখা, যার ভেতর দিয়ে একটি জাতির সামষ্টিক অনুভূতি, বিশ্বাস ও আত্মার স্পন্দন প্রকাশ পায়। 
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লোকসাহিত্যকে “জনপদের হৃদয়-কলরব” বলে অভিহিত করেছেন।
- বিষয়বস্তুর দিক থেকে লোকসাহিত্যকে সাধারণত আটটি শাখায় ভাগ করা হয়—
- ছড়া,
- লোকসঙ্গীত,
- গীতিকা,
- লোককাহিনী,
- লোকনাট্য,
- মন্ত্র,
- ধাঁধা,
- ও প্রবাদ।


- লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি:

- লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি হিসেবে ছড়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- ছড়া কোনো একক ব্যক্তির রচনা নয়; বরং এটি সমাজের সমষ্টিগত চিন্তা ও অভিজ্ঞতার ফল।
- ছড়ার ছন্দই বাংলা কবিতার সবচেয়ে প্রাচীন ছন্দ, যা লৌকিক ছন্দ নামেও পরিচিত।
- সহজ ও সরল ভাষা, জোরালো ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং সংক্ষিপ্ত কাঠামো ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
- মুখে মুখে প্রচলিত হওয়ায় ছড়া দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে।
- ছড়া প্রধানত শিশুদের আনন্দ, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উৎস:
বাংলাপিডিয়া;  
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম। 

২৩.
“নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষাপুরে কি আশা”—এই বিখ্যাত টপ্পাটি রচনা করেছেন কে?
  1. রামনিধি গুপ্ত
  2. শোরী মিঞা
  3. কালী মীর্জা
  4. শ্রীধর কথক
ব্যাখ্যা

নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষাপুরে কি আশা”—এই বিখ্যাত টপ্পাটি রচনা করেছেন- রামনিধি গুপ্ত।
---------------------------------
• টপ্পা:
- টপ্পা হলো ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের চারটি প্রধান ধারার একটি।
- অপর তিনটি হলো ধ্রুপদ, খেয়াল এবং ঠুম্রি।
- টপ্পা দুই প্রকারে বিভক্ত: হিন্দুস্থানি ও বাংলা।
- হিন্দুস্থানি টপ্পাকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল অযোধ্যার নবাব-দরবারের সঙ্গীতজ্ঞ গোলাম নবী বা শোরী মিঞার দ্বারা। 
- আর বাংলা টপ্পার সূচনাকারী হচ্ছে- রামনিধি গুপ্ত। 

- কলকাতা ও তার শহরতলীতে সমসাময়িক কালে টপ্পাগান নামে রাগ-রাগিনী সংযুক্ত এক ধরনের ওস্তাদি গান প্রচলিত ছিল।
- এই গান মূলত হিন্দি টপ্পার আদর্শ অনুসরণ করত।
- বাংলা টপ্পাগানের প্রবর্তক নিধুবাবু চাকরির সময় একজন মুসলমান ওস্তাদের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা নেন।
- এবং শোরী মিঞার হিন্দুস্থানি টপ্পার সঙ্গে পরিচিত হয়ে কলকাতায় এসে বাংলা টপ্পা গানের সৃষ্টিশীল রূপ দেন।
- নিধুবাবুর টপ্পা সংকলনের নাম ছিল ‘গীতরত্ন'।

- বাংলা টপ্পার বৈশিষ্ট্য হলো—
- একেক স্বরের ওপর মধ্যলয়ে দোলায়মান কোমল কম্পন;
- যা গানের কথাগুলিকে স্বাভাবিকভাবে আবৃত্তি করে।
- তবে নিধুবাবু হিন্দুস্থানি টপ্পার রাগ ও তাল প্রায় অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।
- নিধুবাবুর সমসাময়িক এবং পরবর্তী সময়ে বাংলা টপ্পা রচনায় কালী মীর্জা ও শ্রীধর কথক উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

- নিধুবাবু রচিত বিখ্যাত টপ্পা-
- “নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষাপুরে কি আশা” 

- নিধুবাবু শুধু প্রেমসঙ্গীতই নয়, ব্রহ্মসঙ্গীতও টপ্পার ছাঁচে রচনা করেছিলেন।
- যেমন:
- ‘পরমব্রহ্ম তৎপরাৎপর পরমেশ্বর/ নিরঞ্জন নিরাময় নির্বিশেষে সদাশয়/ আপনা আপনি হেতু বিভু বিশ্বধর।’

উৎস: বাংলাপিডিয়া। 

২৪.
নিম্নের কোনটি পূর্ববঙ্গ গীতিকার পালার অন্তর্ভুক্ত? 
  1. কাফেন চোরা
  2. কমল সওদাগর
  3. নেজাম ডাকাইতের পালা
  4. সবকয়টি 
ব্যাখ্যা

পূর্ববঙ্গ-গীতিকা: 
- পূর্ববঙ্গ-গীতিকা পূর্ববাংলার লোকসাহিত্যের একটি সংকলন।
- মুখে মুখে রচিত ও লোকসমাজে প্রচলিত এর পালাগুলি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

• সম্পাদনা ও প্রকাশ: 
- ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় পূর্ববঙ্গ-গীতিকা প্রকাশিত হয়।
- এর প্রকাশে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
- ড. দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত এবং চন্দ্রকুমার দে কর্তৃক সংগ্রহীত “পূর্ববঙ্গ-গীতিকা” গ্রন্থটি প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়।
- এর সংকলন ও প্রকাশ প্রক্রিয়া ১৯২৩ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পন্ন হয়।

• পূর্ববঙ্গ-গীতিকা তিন খন্ডে বিভক্ত।
- প্রথম খণ্ড: মৈমনসিংহ গীতিকা।

• সংগ্রাহক:
- প্রধান সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে।
- এছাড়া জসীমউদ্দীন, আশুতোষ চৌধুরী, নগেন্দ্রচন্দ্র দে প্রমুখের ভূমিকাও রয়েছে।

• বিষয়বস্তু:
- ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফরিদপুর, ত্রিপুরা অঞ্চলের লোকগাঁথা ও পালা;
- সাধারণ মানুষের প্রেম, বেদনা, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও ট্র্যাজেডির চিত্র।

• রচয়িতা: পল্লীর অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত সাধারণ মানুষ; মুখে মুখে রচিত ও গায়েনদের মাধ্যমে পরিবেশিত।
• গুরুত্ব: দীনেশচন্দ্র সেনের ইংরেজি অনুবাদ Eastern Bengal Ballads গ্রন্থের মাধ্যমে বিশ্বপরিসরে পরিচিতি লাভ করে।
• সংখ্যা: পূর্ববঙ্গ-গীতিকায় সংগৃহীত পালার সংখ্যা পঞ্চাশেরও বেশি।

• পালা:
- পূর্ববঙ্গ-গীতিকার পালার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
- ধোপার পাট, মইষাল বন্ধু, কাঞ্চন মালা, কমলা রানীর গান, মদনকুমার ও মধুমালা, নেজাম ডাকাইতের পালা, দেওয়ান ঈশা খাঁ, মাঞ্জুর মা, কাফেনচোরা, ভেলুয়া, হাতিখেদা, আয়নাবিবি, কমল সদাগর, চৌধুরীর লড়াই, গোপিনী-কীর্তন, সুজা-তনয়ার বিলাপ, বারতীর্থের গান, নূরুন্নেছা ও কবরের কথা, পরীবানুর হাঁইলা প্রভৃতি।
- অধিকাংশ পালা চতুর্দশ শতকে রচিত হলেও কিছু পালার সৃষ্টি ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে হয়েছে।

উৎস: বাংলাপিডিয়া।

২৫.
দ্বিজ কানাই রচিত ‘মহুয়া’ পালায় বেদে সম্প্রদায়ের সর্দারের নাম কী ছিল?
  1. কুব্বাত আলী
  2. রতন সর্দার
  3. হুমরা 
  4. সমিরন
ব্যাখ্যা

দ্বিজ কানাই রচিত ‘মহুয়া’ পালায় বেদে সম্প্রদায়ের সর্দারের নাম ছিল- হুমরা বাইদ্যা। 
-------------------------
'মহুয়া পালা':
- ‘মহুয়া পালা’, দ্বিজ কানাই (১৬৫০) রচিত, মৈমনসিংহ গীতিকার অন্যতম জনপ্রিয় ও করুণ প্রেমকাহিনী। কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো বেদে সম্প্রদায়ের কন্যা মহুয়া এবং জমিদার নদের চাঁদ। মহুয়া শৈশবে হুমরা বাইদ্যা নামে এক বেদে সর্দারের কাছে চলে যায় এবং বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যেই বড় হয়। বড় হয়ে মহুয়া সাপের খেলা দেখাতে শিখে। একদিন হুমরা বেদের দল বাউলের গ্রামে আসে, সেখানেই মহুয়া ও নদের চাঁদের মধ্যে গভীর প্রেম গড়ে ওঠে। তাদের প্রেম জনসমাজের নজরে আসলে সামাজিক বাধার সৃষ্টি হয়। নদের চাঁদের আত্মীয় ও সমাজের চাপের কারণে হুমরা বাইদ্যা মহুয়াকে অন্যত্র নিয়ে যায়। নদের চাঁদ মহুয়াকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেও, শেষপর্যন্ত হুমরা বাইদ্যা মহুয়াকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করে। মহুয়া প্রেমের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আত্মবলিদান দেয়, নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার পর নদের চাঁদও মহুয়ার বিরহে সংসার ত্যাগ করেন।

- মহুয়া পালার গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি:
• ছয় মাসের শিশু কইন্যা পরমা সুন্দরী রাত্রি।। 
নিশাকালে হুমরা তার করল চুরি।। 

• লজ্জা নাই নিলজ্জ ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর।। 
গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর।। 

• কোথায় পাব কলসী কইন্যা কোথায় পাব দড়ি।। 
তুমি হও গহিন গাঙ আমি ডুব্যা মরি।। 
------------
মৈমনসিংহ গীতিকা:
- মৈমনসিংহ গীতিকা হলো বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল (বর্তমান কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা) থেকে সংগৃহীত প্রাচীন লোকগাথা ও পালাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।
- এটি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত গল্প ও গানসমূহকে একত্রিত করেছে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত।
- ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন স্থানীয় সংগ্রাহকদের সহায়তায় এই গীতিকাগুলো সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।
- মূল সংগ্রাহক ছিলেন চন্দ্রকুমার দে।
- মৈমনসিংহ গীতিকার কাহিনিগুলো সাধারণ মানুষের জীবন, নারীর প্রেম, সংগ্রাম ও ট্রাজিক পরিণতি নিয়ে রচিত।
- ভাষা সহজ, সরল ও গ্রামীণ ছন্দময়। 
- এই সংকলন বিশ্বসাহিত্যে স্বীকৃত এবং ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
- সৌরভ পত্রিকায় কেদারনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় এর দুটি পালা প্রথম প্রকাশিত হয়। 

• সংকলনে ১০টি গীতিকা ও রূপকথা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
- যেমন:
- মহুয়া,
- মলুয়া,
- চন্দ্রাবতী,
- কমলা,
- দেওয়ান ভাবনা,
- দস্যু কেনারামের পালা,
- রূপবতী,
- কঙ্ক ও লীলা,
- কাজলরেখা (রূপকথা),
- দেওয়ানা মদিনা।

উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।