উত্তর
ব্যাখ্যা
গীতার প্রথম অধ্যায় হলো অর্জুন-বিষাদ যোগ। এখানে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের সময় অর্জুন আত্মীয়দের দেখে বিষাদগ্রস্ত হয়ে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই দ্বন্দ্ব থেকেই গীতার সূচনা।
৪৯তম বিসিএস ⎯ সংস্কৃত [১৫১] · তারিখ অনির্ধারিত · ৩৯ প্রশ্ন
গীতার প্রথম অধ্যায় হলো অর্জুন-বিষাদ যোগ। এখানে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের সময় অর্জুন আত্মীয়দের দেখে বিষাদগ্রস্ত হয়ে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই দ্বন্দ্ব থেকেই গীতার সূচনা।
গীতার প্রথম শ্লোকে ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়কে জিজ্ঞাসা করেন – ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেত যোদ্ধারা কী করছে? এখান থেকেই গীতা শুরু।
অর্জুন দেখলেন কুরুক্ষেত্রে দুই পক্ষের যোদ্ধারা তার আপনজন। তাদের হত্যা করলে পাপ হবে—এই দ্বিধাতেই তিনি যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৃষ্ণ অর্জুনের রথচালক হন। এভাবেই তিনি তাকে উপদেশ দেওয়ার সুযোগ পান, যা পরে গীতা নামে পরিচিত হয়।
অর্জুন আত্মীয়দের হত্যা করতে হবে ভেবে করুণাভরে ভেঙে পড়েন। তার শরীর কাঁপতে থাকে, গাণ্ডীব ধনুক হাত থেকে পিছলে যায়। তাই অধ্যায়ের নাম অর্জুন-বিষাদ যোগ।
প্রথম অধ্যায়ে উভয় পক্ষের সেনাপতি ও যোদ্ধাদের নাম ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় উল্লেখ করেন। যেমন ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, ভীম, অর্জুন প্রমুখ।
অর্জুন বলেন—যুদ্ধে আত্মীয়দের মারা গেলে বংশধ্বংস, ধর্মনাশ ও নরকগতি হবে। কিন্তু "যশ লাভ" তিনি যুদ্ধ না করার যুক্তি হিসেবে কখনোই দেননি।
যুদ্ধের আগে অর্জুন বিষণ্ণ হয়ে গাণ্ডীব ধনুক ফেলে দেন ও রথে বসে পড়েন। তখন কৃষ্ণ তাকে শিক্ষা দিতে শুরু করেন।
অর্জুন-বিষাদ যোগে তার মনোবেদনা, করুণা ও আত্মীয়হত্যার ভয়ে দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এর মধ্য দিয়েই গীতার মূল শিক্ষার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।
গীতা মহাভারতের ভীষ্মপর্বের অংশ, ৭০০ শ্লোকে সংকলিত। মহাভারত ব্যাসদেব রচিত, আর গীতাকে বলা হয় “উপনিষদ্সার”। এতে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ম, জ্ঞান ও যোগের শিক্ষা প্রদান করেন।
গীতাকে বলা হয়— উপনিষদসমূহের সার, কারণ এতে আত্মা, ব্রহ্ম ও যোগের মূল শিক্ষা আছে। একে মহাভারতের হৃদয় বলা হয়, কারণ মহাভারতের কেন্দ্রীয় দার্শনিক অংশ এটি। গীতা হলো যোগশাস্ত্রও, যেখানে জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ, ভক্তিযোগ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গীতার প্রথম শ্লোকটি ধৃতরাষ্ট্রের মুখে উচ্চারিত— “ধৃতরাষ্ট্র উবাচ”। তিনি সঞ্জয়কে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের বিবরণ জিজ্ঞাসা করেন। সঞ্জয় তখন দৃষ্টিদানপ্রাপ্ত হয়ে সবকিছু বর্ণনা করতে থাকেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮টি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে ভিন্ন যোগ ও জ্ঞানের দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন— প্রথম অধ্যায় অর্জুনবিষাদযোগ, শেষ অধ্যায় মোক্ষসংন্যাসযোগ।
তৃতীয় অধ্যায়— কর্মযোগ, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন— নিষ্কাম কর্মই মুক্তির পথ। শুধু জ্ঞান বা ভক্তিই নয়, কর্তব্যকর্মকে ফলাসক্তিহীনভাবে সম্পাদন করাই শ্রেষ্ঠ যোগ।
একাদশ অধ্যায়— বিশ্বরূপ দর্শনযোগ, এখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করে তাঁর বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন। অর্জুন এতে অভিভূত হয়ে কৃষ্ণকে সর্বোচ্চ ঈশ্বররূপে উপলব্ধি করেন।
অষ্টাদশ অধ্যায়— মোক্ষসংন্যাসযোগ, যেখানে জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির সমন্বয়ে পরমমুক্তির পথ বর্ণিত হয়েছে। এই অধ্যায়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে চূড়ান্তভাবে শরণাগতির শিক্ষা দেন।
কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দেন। যুদ্ধের কাহিনি সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে শোনান (দিব্যদৃষ্টিপ্রাপ্ত)। পুরো মহাভারত বৈশম্পায়ন জনমেজয়কে বর্ণনা করেন; আর বিভিন্ন স্থানে সৌতি শৌনকাদের বলেন। এই বহুস্তরীয় ন্যারেটিভ ফ্রেম বোঝা পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
ভীষ্মপর্বে গীতা সংকলিত। প্রচলিত সমন্বিত পাঠে ১৮ অধ্যায় ও ৭০০ শ্লোক ধরা হয় (কিছু আঞ্চলিক পাঠভেদের সামান্য তারতম্য থাকলেও পরীক্ষায় ৭০০-ই স্ট্যান্ডার্ড)। এই তথ্যটি সরাসরি এমসিকিউতে আসে।
২য় অধ্যায় “সাঙ্খ্যযোগ”—আত্মার অবিনাশিতা স্থাপন করে; সেখানেই নিষ্কাম কর্ম-নীতির বীজ (২.৪৭ ইত্যাদি) রোপণ হয়। গীতা জ্ঞান–কর্ম–ভক্তি—এই ত্রয়ীর সামঞ্জস্য চায়; জ্ঞান বোধ জাগায়, কর্ম অহংমুক্ত সেবারূপে জীবনে প্রয়োগ ঘটায়।
গীতা কর্মপলাশ্রয়ী নৈতিকতা শেখায়—কর্তব্য করো, কিন্তু ফলাসক্তি ত্যাগ করি। এতে অহংকার–দুঃখ কমে, কর্ম যোগ হয়ে ওঠে। ফলবিমুখতা অকর্মণ্যতা নয়; বরং দায়িত্বশীল কর্মের আধ্যাত্মিক রূপান্তর।
৩য় অধ্যায়ে কাম–ক্রোধকে মহাশত্রু বলা হয়; এগুলো রজোগুণজাত, জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে। এদের নিয়ন্ত্রণে অভ্যাস, বৈরাগ্য, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ জরুরি। নইলে কর্ম স্বার্থ–হিংসায় কলুষিত হয়।
প্রাচীন গণনায় গীতার শ্লোকসংখ্যা ৭০০ ধরা হয়। ভীষ্মপর্বে মোট ৭০০ শ্লোক গীতারূপে সংকলিত হয়েছে। তবে কিছু পাঠভেদে এক-দুইটি শ্লোক অতিরিক্ত পাওয়া যায়।
গীতার মূল উদ্দেশ্য মানবজীবনের কর্তব্য, ধর্ম, জ্ঞান ও ভক্তির মেলবন্ধন ঘটানো। কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের উপদেশ দেন। এতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্মের চিরন্তন নীতি শেখানো হয়েছে।
গীতা কৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রশ্নোত্তরমূলক সংলাপ। অর্জুন বিভ্রান্ত হলে কৃষ্ণ তাঁকে কর্তব্য ও ধর্মের শিক্ষা দেন। সংলাপধর্মী আকারে গীতা সহজবোধ্য ও উপদেশমূলক হয়ে উঠেছে।
গীতায় কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ আলোচিত হলেও কৃষ্ণ কর্মযোগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ ফলের প্রতি আসক্তি না রেখে কর্তব্যকর্ম সম্পাদনই প্রকৃত ধর্ম। এজন্য গীতা কর্মনিষ্ঠ জীবনের আদর্শ গ্রন্থ।
উপনিষদে যেমন আত্মা, পরমাত্মা ও ব্রহ্মতত্ত্ব আলোচনা করা হয়, তেমনি গীতায়ও সেই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই গীতাকে কখনো “গীতোপনিষদ” বলা হয়। এটি দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার সারাংশ।
গীতার মূল লক্ষ্য মানুষের কর্তব্য নির্ধারণ ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ প্রদর্শন। কৃষ্ণ অর্জুনকে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের মাধ্যমে জীবনের চূড়ান্ত সত্য উপলব্ধি করান। তাই এটি জীবনদর্শনের সারগ্রন্থ।
গীতায় কৃষ্ণ কর্তব্যকর্মকে আসক্তিহীনভাবে সম্পাদনের নির্দেশ দেন। কর্মই জীবনের ভিত্তি, তবে তার ফলের প্রতি লোভ না রাখাই প্রকৃত যোগ। এই নীতি আধুনিক জীবনেও সমান প্রাসঙ্গিক।
গীতা ধর্ম, কর্ম ও ভক্তির সর্বজনীন শিক্ষা দেয়, যা কেবল একটি ধর্মের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যেকোনো জাতি বা কালের মানুষের জন্য এর শিক্ষাগুলো প্রযোজ্য। এজন্য গীতার প্রভাব বিশ্বব্যাপী।
গীতাকে শুধু ধর্মীয় নয়, বরং সর্বজনীন জীবনদর্শনের সারগ্রন্থ বলা হয়। এতে জীবনের সমস্যার সমাধান, কর্তব্য, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ আলোচিত হয়েছে।
নবম অধ্যায়ের নাম “রাজবিদ্যা রাজগুহ্য যোগ”। এতে কৃষ্ণ ভক্তির মাহাত্ম্য ও ভক্তের প্রতি নিজের সর্বাত্মক আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেন।
একাদশ অধ্যায় “বিশ্বরূপ দর্শন যোগ”। এখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দেন এবং তাঁর বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন। এই রূপ অসীম, ভীতিজাগানিয়া ও অলৌকিক।
গীতায় মূলত সাংখ্য দর্শনের জ্ঞানতত্ত্ব ও যোগ দর্শনের সাধনাপদ্ধতি আলোচিত হয়েছে। কৃষ্ণ এগুলোকে ভক্তি ও কর্মের সঙ্গে সমন্বয় করেছেন।
চতুর্দশ অধ্যায় “ত্রিগুণ বিভাগ যোগ”। এখানে কৃষ্ণ তিনটি প্রাকৃতিক গুণ— সত্ত্ব, রজ ও তম— এর প্রভাব ব্যাখ্যা করেন। এগুলো মানুষকে বেঁধে রাখে এবং মুক্তির পথে বাধা হয়।
দ্বিতীয় অধ্যায় “সাংখ্যযোগ”-এ কৃষ্ণ আত্মার অমরত্ব ও শরীরের নশ্বরতা বর্ণনা করেন। আত্মা জন্মমৃত্যুর ঊর্ধ্বে— এই শিক্ষা গীতার মৌলিক ভিত্তি।
সপ্তম অধ্যায় হলো “জ্ঞান-বিজ্ঞান যোগ”। এখানে কৃষ্ণ নিজের প্রকৃতি, ভক্তির মাহাত্ম্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় আলোচনা করেন।
ষোড়শ অধ্যায়ে মানুষকে দুই প্রকারে বিভক্ত করা হয়েছে— দैব (শুভ) ও আসুর (অশুভ) স্বভাব। এই অধ্যায় নৈতিক শিক্ষার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
গীতায় ধর্ম মানে নিজের কর্তব্যকর্ম। কৃষ্ণ বলেন, স্বধর্ম পালন করা পরধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই কর্তব্যই প্রকৃত ধর্ম।
অষ্টাদশ অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেন— “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ”। অর্থাৎ সব ধর্ম-কর্ম ত্যাগ করে কেবল তাঁর শরণ নেওয়াই মুক্তির চূড়ান্ত উপায়। এটাই গীতার সমাপ্তি বাণী।