উত্তর
ব্যাখ্যা
‘ছন্দ’ শব্দটি √ছদ্ ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ আচ্ছাদন বা ঢেকে রাখা। এখানে ছন্দ কবিতার ছন্দোবদ্ধতা বা মাত্রাবিন্যাসকে আচ্ছাদনের মতো সাজায়।
৪৯তম বিসিএস ⎯ সংস্কৃত [১৫১] · তারিখ অনির্ধারিত · ৪১ প্রশ্ন
‘ছন্দ’ শব্দটি √ছদ্ ধাতু থেকে গঠিত, যার অর্থ আচ্ছাদন বা ঢেকে রাখা। এখানে ছন্দ কবিতার ছন্দোবদ্ধতা বা মাত্রাবিন্যাসকে আচ্ছাদনের মতো সাজায়।
সংস্কৃত সাহিত্যে ছন্দকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্ররূপে গণ্য করা হয়—‘ছন্দশাস্ত্র’। এটি পদ্যরচনার ছন্দোবিন্যাসের নিয়ম নির্ধারণ করে।
ছন্দশাস্ত্রের প্রাচীনতম ভিত্তি হলো বেদ। বেদের মন্ত্রসমূহ ছন্দোবদ্ধ রূপে রচিত, যেমন গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ, জগতি ইত্যাদি।
ছন্দ পদ্যকে সুশৃঙ্খল, শ্রুতিমধুর ও সঙ্গীতময় করে তোলে। এটি শ্রোতার মনে প্রভাব বিস্তার করে এবং রচনার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
সংস্কৃত কাব্যে ছন্দকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়— বর্ণবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত।
বর্ণবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি পাদে নির্দিষ্ট অক্ষরসংখ্যা থাকে। যেমন শার্দূলবিক্রীড়িত (১৯ অক্ষর), মন্দাক্রান্তা ইত্যাদি।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অক্ষর নয়, বরং মাত্রা নির্দিষ্ট থাকে। যেমন আর্য, গীতি ইত্যাদি।
তবে আধুনিক বিশ্লেষণে ‘গণবৃত্ত’কেও আলাদা ধরা হয়, কিন্তু প্রাচীন শাস্ত্র মতে মূলত এই দুটি প্রকারই প্রধান।
বর্ণবৃত্ত ছন্দে অক্ষরসংখ্যাই প্রধান নিয়ামক। প্রতিটি পাদে নির্দিষ্ট সংখ্যক অক্ষর থাকতে হয়, আর সেই সংখ্যা ভঙ্গ হলে ছন্দও ভেঙে যায়। যেমন – শার্দূলবিক্রীড়িত ছন্দে প্রতিটি পাদে ঠিক ১৯টি অক্ষর থাকতে হবে। এখানে মাত্রা নয়, বরং অক্ষরের সংখ্যা ও তাদের বিন্যাসই ছন্দের ছন্দোবদ্ধতা নির্ধারণ করে। তাই বর্ণবৃত্তে অক্ষরই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অক্ষর সংখ্যা সমান না হলেও মাত্রার সংখ্যা সমান হয়। এটি স্বরবৃত্তের মতো ধ্বনিমাধুর্য রক্ষা করে।
গণবৃত্ত ছন্দে লঘু (⏑) ও গুরু (–) অক্ষরের গণ বা সমষ্টি মুখ্য। এখানে অক্ষরের নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, বরং লঘু-গুরু মিলিয়ে গঠিত গণের সংখ্যা ও বিন্যাস ছন্দের গঠন নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যগণ (⏑⏑–), রগণ (–⏑–), মগণ (–––) প্রভৃতি গণের ধারাবাহিক উপস্থিতি অনুযায়ী ছন্দ নির্ধারিত হয়। তাই গণবৃত্ত ছন্দ গণসংখ্যা অনুসারেই চলে।
অনুষ্টুপ ছন্দই মূলত শ্লোক নামে পরিচিত। এতে চারটি পাদ থাকে এবং প্রত্যেক পাদে ৮টি অক্ষর থাকে, অর্থাৎ মোট ৩২ অক্ষরের গঠন। রামায়ণ, মহাভারতসহ অধিকাংশ মহাকাব্য প্রধানত অনুষ্টুপ/শ্লোক ছন্দে রচিত। এটি সংস্কৃত সাহিত্যের সবচেয়ে প্রচলিত ও সহজ ছন্দ, যার মাধ্যমে ভাব প্রকাশ স্পষ্ট ও গম্ভীরভাবে ফুটে ওঠে।
বৃহতী ছন্দে প্রতিটি মন্ত্র বা পদ্যের গঠন হয় ৩৬ অক্ষরে। এটি মূলত বেদীয় ছন্দ, যা ঋগ্বেদের বহু সূক্তে ব্যবহৃত হয়েছে। গায়ত্রী (২৪ অক্ষর), অনুষ্টুপ (৩২ অক্ষর), ত্রিষ্টুপ (৪৪ অক্ষর) প্রভৃতির মধ্যবর্তী একটি ছন্দ হলো বৃহতী। এর গাম্ভীর্যপূর্ণ ধ্বনি বেদীয় স্তোত্রপাঠকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে।
যেভাবে মাতা সন্তানকে রক্ষা করে, তেমনি ছন্দও বেদীয় মন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় ও আকার প্রদান করে। ছন্দ না থাকলে বেদের মন্ত্রগঠন ভেঙে যেত। এজন্য ঋগ্বেদে ছন্দকে "বেদমাতা" বলা হয়েছে।
সংস্কৃত ছন্দে দীর্ঘ স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনের পরে অবস্থানকারী হ্রস্ব স্বরকে গুরু ধরা হয়, যা ২ মাত্রা সমান। লঘু (হ্রস্ব) ধরা হয় ১ মাত্রা। এই ভিত্তিতেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দ গঠিত হয়।
আর্য ছন্দে অক্ষর সংখ্যা সমান থাকে না। এর বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি পাদে সমান মাত্রা বজায় থাকে। এজন্য এটি কঠিন ছন্দের অন্তর্ভুক্ত।
শার্দূলবিক্রীড়িত হলো বর্ণবৃত্ত ছন্দ। এতে প্রতিটি পাদে ১৯ অক্ষর থাকে। এটি রাজসিক ভাব প্রকাশের জন্য প্রসিদ্ধ।
মন্দাক্রান্তা ছন্দের গতি দ্রুত, এর সুর মধুর ও তরঙ্গায়িত। তাই কালিদাস ‘মেঘদূত’-এ এই ছন্দ ব্যবহার করেছেন দূতের দ্রুতগতির যাত্রা বোঝাতে।
আর্য ছন্দে একটি পূর্ণ পদ্যকে সাধারণত গাথা বলা হয়। প্রতিটি গাথা থাকে চার পাদবিশিষ্ট, যেখানে প্রতিটি পাদের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রা-সংখ্যা নির্ধারিত থাকে। যেমন প্রথম ও তৃতীয় পাদে ১২ মাত্রা, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পাদে ১৮ মাত্রা। এই নিয়মে গঠিত চার পাদ একত্রে একটি গাথা গঠন করে। তাই আর্য ছন্দে গাথা বলতে চার পাদকেই বোঝানো হয়।
ছন্দে লঘু (⏑) ও গুরু (–) অক্ষরের সুনিপুণ বিন্যাস কবিতায় সুরেলা গতি ও ছন্দোবদ্ধতা আনে। এর ফলে পাঠ বা আবৃত্তি শ্রুতিমধুর হয় এবং পদ্যে একটি স্বাভাবিক অলঙ্কারধর্মিতা যোগ হয়। লঘু ও গুরু অক্ষরের সমতা ভঙ্গ হলে ছন্দ মলিন হয়ে যায়, আর সঠিক বিন্যাসে থাকলে তা কাব্যের সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি করে।
জগতি ছন্দ হলো এক বিশেষ বেদীয় ছন্দ। এতে প্রতিটি পাদে ১২টি অক্ষর থাকে। অর্থাৎ একটি পূর্ণ জগতি ছন্দে মোট ৪৮ অক্ষর হয়। গায়ত্রী (২৪), অনুষ্টুপ (৩২), ত্রিষ্টুপ (৪৪) ইত্যাদির তুলনায় জগতি দীর্ঘতর। এর ধ্বনিগাম্ভীর্য ও স্থিরতা ধর্মীয় মন্ত্রপাঠে বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। তাই জগতি ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রতি পাদে ১২ অক্ষর।
বর্ণবৃত্তে নির্দিষ্ট অক্ষরসংখ্যা বজায় না থাকলে ছন্দে অক্ষরভঙ্গ দোষ ঘটে। যেমন ১৭ অক্ষরের স্থানে ১৬ হলে তা ভুল গণ্য হয়।
মাত্রাবিন্যাস হলো লঘু ও গুরু অক্ষরের ধারাবাহিক বিন্যাস। এর মাধ্যমে ছন্দের গতি, সুর ও ছন্দোবিন্যাস নির্ধারিত হয়। এটি ছন্দ বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ছন্দে নির্দিষ্ট স্থানে লঘু (১ মাত্রা) ও গুরু (২ মাত্রা) নিয়মিতভাবে বসে। ভুল স্থানে গুরু ব্যবহার হলে ছন্দের ছন্দোবদ্ধতা ভেঙে যায়, শ্রুতিমাধুর্যও নষ্ট হয়।
বর্ণবৃত্ত ছন্দ অক্ষরনির্ভর। প্রতিটি পাদে সমান অক্ষর থাকতে হয়। তাই এর বিশ্লেষণে প্রথমেই অক্ষরসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়, পরে লঘু-গুরু বিবেচনা করা হয়।
পদ্য বা শ্লোক সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত থাকে, যাকে ‘পাদ’ বলা হয়। ছন্দ বিশ্লেষণে প্রতিটি পাদের অক্ষর ও মাত্রা আলাদা আলাদাভাবে গণনা করা হয়। এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ছন্দের রূপ বোঝা যায়।
গণ নির্ণয়ের জন্য প্রথমে প্রতিটি অক্ষরকে লঘু-গুরুতে চিহ্নিত করতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট গণ (য, মা, তা ইত্যাদি) অনুসারে বিন্যাস করা হয়। এভাবে ছন্দের শ্রেণি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
বর্ণবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি পাদে সমান সংখ্যক অক্ষর থাকে। তাই একে ‘অক্ষরবৃত্ত’ও বলা হয়। এটি সবচেয়ে প্রচলিত ছন্দের ধরন, যেমন শার্দূলবিক্রীড়িত, মন্দাক্রান্তা।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি পাদের অক্ষরের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মাত্রা সমান থাকে। যেমন আর্য ছন্দে প্রতিটি পাদে নির্দিষ্ট মাত্রা বজায় থাকে, অক্ষর ভিন্ন হলেও।
গণবৃত্ত ছন্দ হলো ছন্দের একটি প্রকার, যা লঘু (⏑) ও গুরু (–) অক্ষরের গণের বিন্যাস অনুযায়ী চলে। এখানে অক্ষরের মোট সংখ্যা নয়, বরং গণ (যমক, রগণ, মগণ ইত্যাদি) এবং তাদের ধারাবাহিকতা ছন্দের সুষমা নির্ধারণ করে। ছন্দ বিশ্লেষণে প্রতিটি পাদে গণের ধরন ও ক্রম অনুযায়ী ছন্দের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়। তাই গণবৃত্ত ছন্দের মূল ভিত্তি হলো গণ বিন্যাস।
শার্দূলবিক্রীড়িত ছন্দে প্রতিটি পাদে ১৯ অক্ষর থাকে। এটি অক্ষরসংখ্যা নির্ভর হওয়ায় বর্ণবৃত্ত ছন্দভুক্ত। মহাকাব্যে রাজসিক ভাব প্রকাশে এটির ব্যবহার বিশেষ।
মন্দাক্রান্তা বর্ণবৃত্ত ছন্দ, এর দ্রুত ও তরঙ্গায়িত গতি দূতের যাত্রা বা ত্বরিত গতি প্রকাশে ব্যবহার হয়। কালিদাস ‘মেঘদূত’-এ এই ছন্দ প্রয়োগ করেছেন।
গণবৃত্ত ছন্দে নির্দিষ্ট গণ (য, মা, তা ইত্যাদি) বারবার ব্যবহৃত হয়, আর মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মাত্রার সমতা বজায় থাকে। এই দুই ভিন্ন নিয়ম ছন্দকে পৃথক করে।
বেদের গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ, জগতি প্রভৃতি ছন্দ সবই নির্দিষ্ট অক্ষরসংখ্যার ভিত্তিতে গঠিত। তাই এগুলো বর্ণবৃত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বেদে এই ছন্দগুলো মন্ত্রোচ্চারণকে সুরেলা করে তোলে।
ছন্দশাস্ত্রের প্রাচীনতম রচয়িতা হলেন পিঙ্গল। তাঁর ‘পিঙ্গলছন্দশাস্ত্র’ সংস্কৃত ছন্দের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে মান্য। তিনি লঘু-গুরু, গণ ও ছন্দবিভাগ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছে
পিঙ্গলসূত্র হলো ছন্দশাস্ত্রের মৌলিক গ্রন্থ। এখানে ছন্দের প্রকার, গণ, বিশ্লেষণ, অক্ষর ও মাত্রার নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে। তাই এটি সংস্কৃত ছন্দবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর।
বেদের ছয় অঙ্গ আছে— শিক্ষা, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, কাল্প ও জ্যোতিষ। এর মধ্যে ছন্দ একটি, তাই ছন্দশাস্ত্রকে ‘বেদাঙ্গ’ বলা হয়।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি পাদে নির্দিষ্ট মাত্রা থাকতে হয়। যদি কোনো পাদে নির্ধারিত মাত্রা ভেঙে যায় তবে তাকে মাত্রাভঙ্গ বলে। এটি ছন্দের সুষমা নষ্ট করে।
ছন্দ বিশ্লেষণে য, ম, ত ইত্যাদি গণ হলো লঘু (⏑) ও গুরু (–) অক্ষরের নির্দিষ্ট সমষ্টি বা ধারা। যেমন – যগণ (⏑⏑–), মগণ (–––), তগণ (⏑–⏑–)। এগুলো গণবৃত্ত ছন্দের মূল ভিত্তি, যা ছন্দের সুষমা, গতি ও সৌন্দর্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, গণগুলো ছন্দের বিন্যাস নির্দেশ করে, আর এগুলো ছন্দ বিশ্লেষণে অপরিহার্য।
বেদের মন্ত্র ছন্দোবদ্ধভাবে রচিত কারণ ছন্দ মন্ত্রকে সুরেলা করে তোলে। এটি উচ্চারণ সহজ করে এবং আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
শ্লোক হলো সংস্কৃত সাহিত্যের সবচেয়ে প্রচলিত ছন্দ, যা মূলত অনুষ্ঠুপ ছন্দে রচিত হয়। এতে প্রতিটি পাদে ৮টি অক্ষর থাকে, মোট ৩২ অক্ষরের গঠন। মহাকাব্য যেমন রামায়ণ ও মহাভারত প্রায়শই শ্লোক/অনুষ্ঠুপ ছন্দে রচিত। অনুষ্ঠান ছন্দের ধ্বনি গম্ভীর ও সহজ, যা কাব্যের ভাব প্রকাশ ও আবৃত্তি সহজতর করে।
একটি শ্লোক সাধারণত চার ভাগে বিভক্ত হয়, প্রতিটি ভাগকে পাদ বলে। ছন্দ বিশ্লেষণে প্রতিটি পাদের অক্ষর, মাত্রা, গণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
শার্দূলবিক্রীড়িত হলো বর্ণবৃত্ত ছন্দ, প্রতিটি পাদে ১৯ অক্ষর থাকে। এর গাম্ভীর্যপূর্ণ সুর বীরত্ব প্রকাশের জন্য মহাকাব্যে বহুল ব্যবহৃত।
কালিদাস ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’-এ আর্য ছন্দ বিশেষভাবে ব্যবহার করেছেন। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এবং নাটকের আবেগ ও সংলাপ প্রকাশে উপযোগী।