জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিখ হেগেল:
- আধুনিক কালের পূর্ণতাবাদ বা কল্যাণবাদের প্রসিদ্ধ চিন্তাবিদ হলেন হেগেল।
- তার ভাববাদের উপর ভিত্তি করেই তার নীতিদর্শন স্থাপিত।
- তিনি মনে করেন যে, পরমাত্মা বা পরমসত্তাই একমাত্র স্বনির্ভর সত্তা এবং জীবাত্মাও। জড়বস্তু পরমাত্মারই খণ্ড প্রকাশ মাত্র।
হেগেলীয় পূর্ণতাবাদ:
- জার্মান দার্শনিক জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিখ হেগেলের দর্শন অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও জটিল।
- তাঁর নীতিদর্শনও তাই জটিলতামুক্ত নয়।
- তবে কয়েকটা বিষয় বেশ স্পষ্ট আর তা হচ্ছে ⎯
১. জগতের সব কিছুই এক পরম সত্তার (absolute) প্রকাশ এবং এই প্রকাশটি ঘটে বিবর্তনের ধারায় একটা ক্রমবিকাশমান প্রক্রিয়া হিসেবে।
- এ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে আত্ম-সচেতনতার (self-consciousness) সৃষ্টি যা পরম সত্তার গুণ। জগতে এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে মানুষের মধ্যে।
- হেগেলের মতে যার মধ্যে এর প্রকাশ যত বেশি সে তত বেশি আত্ম-বাস্তবায়ন সাধন করে এবং পূর্ণ মানুষে পরিণত হয়।
২. মানুষ পূর্ণ আত্ম-সচেতনতায় পৌঁছে একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
- এ প্রক্রিয়ার মূলকথা হচ্ছে মানুষের চিন্তা প্রথমে একটি মত গঠন করে। এরপর সে তা বাতিল করে দ্বিতীয় একটি প্রতিমত গঠন করে এবং এ দুটো মিলে এরপর সে আবার ততীয় একটি সমন্বয়-মত গঠন করে। এ সমন্বয় মত আবার সময়মত একটি মত হিসেবে অপর একটি প্রতি-মতের সষ্টি করে এবং এভাবে চিন্তা পর্ণতার দিকে এগিয়ে চলে।
৩. জগতে একটা আঙ্গিক ঐক্য রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে জগৎ একটি সামগ্রিক সত্তা এবং এর কোন অংশকে অন্য একটি অংশের সঙ্গে কিংবা সমগ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে না দেখে উপায় নেই। অন্যভাবে বলা যায়, জগতে কোন কিছুরই আলাদা ও স্বনির্ভর অস্তিত্ব নেই।
⇒ হেগেলের পূর্ণতাবাদের ব্যাখ্যা প্রদান করে তেমন দুটি উক্তি খুবই প্রসিদ্ধ। এগুলো হচ্ছে:
i) Be a person ⎯ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হও/মানুষ হও।
ii) Die to live ⎯ বাঁচার জন্য মরো/মরে বাঁচ।
- এই মতবাদ ও উক্তি দুটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে তার - The Phenomenology of Spirit (1807) গ্রন্থে।
i) ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন হও/মানুষ হও (Be a person):
- আত্ম-সচেতনতাই যদি মানুষের লক্ষ্য হয় এ তার মধ্যে এমন একটি বোধের সষ্টি করে যাকে আমরা তার ব্যক্তিত্ববোধ বলতে পারি। এ ব্যক্তিত্ববোধ নিছক অন্যান্য প্রাণীদের স্বাতন্ত্র্যবোধের মত নয়।
- মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীরা তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বুঝতে পারে এই অর্থে যে, তারা অন্যের বিরুদ্ধে ভিন্ন সত্তা হিসেবে নিজেকে জাহির করে, অন্যকে তার জীবন থেকে স্বতন্ত্র করে দেখে এবং সময়ে নিজে পরিতপ্তির জন্য তাদের সংগে মারামারি করে।
- কিন্তু মানুষ এর ঊর্ধ্বেও নিজ অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করতে পারে। তার স্বাতন্ত্র্যবোধ তাকে যেখানে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখে, তার ব্যক্তিত্ববোধের কল্যাণে তাদের সংগে সে নিজেকে জড়িত করে ফেলে। আর এর ফলে সময়ে সে অপরের জন্য আত্মোৎসর্গও করে।
- হেগেলের মতে ব্যক্তিত্ব বলতে তাই নৈতিক ব্যক্তিত্বকে বুঝায়। ইন্দ্রিয়বৃত্তি নির্মূল করে বৌদ্ধিক জীবন লাভ করাতেই মানুষের পূর্ণতা নিহিত।
ii) বাঁচার জন্য মরো/মরে বাঁচ (Die to live):
- মানুষ যেহেতু আত্মসচেতন জীব এবং যেহেতু তার ব্যক্তিত্ব রয়েছে, সেহেতু সে অপরাপর জীব থেকে পৃথক।
- কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তাদের সংগে তার কিছু মিলও রয়েছে। যেমন তার রয়েছে কিছু ইন্দ্রিয়বত্তি। এগুলোকে দমন করতে না পারলে প্রকত আত্ম-সচেতনতা তথা বৌদ্ধিক জীবন লাভ হয় না।
- অথচ ঐ জীবনেই রয়েছে মানুষের মুক্তি তথা সমস্ত ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা ও স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি। এ কারণে মানুষকে তার প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করতে হবে; অন্যকথায় তার জীববত্তিমূলক জীবনকে হত্যা করতে হবে। এতে করে প্রকতপক্ষে সে বেঁচে যাবে।
উৎস: i) নীতিবিদ্যা, এসএসএইচএল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
ii) Britannica.