PrepBank · বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ
PrepBank · পাতা ১১ / ১১ · ১,০০১–১,০৩৫ / ১,০৩৯
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদ:
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ/কবিতা সংকলন/ গানের সংকলন।
- এটি বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।
- ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদের পুথি আবিষ্কার করেন।
- ১৯১৬ সালে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে চর্যাপদ আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয়।
- মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় পুথিখানি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
- চর্যাপদের চর্যাগুলো রচনা করেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ। চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়েছে।
- সুকুমার সেনের 'বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস' (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে চর্যাপদের ২৪ জন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে চর্যাপদের ২৩ জন কবির নাম উল্লেখ আছে।
- সুকুমার সেন মনে করেন যে, চর্যাপদের পদসংখ্যা - ৫১টি; তবে তিনি তার 'চর্যাগীতি পদাবলী' গ্রন্থে ৫০টি পদের উল্লেখ করেছেন। আলোচনা অংশে তার বক্তব্য মুনিদত্ত ৫০টি ব্যাখ্যা করেছিলেন।
- আবার ড. শহীদুল্লাহ চর্যাপদের পদ সংখ্যা ৫০টি বলে মনে করেন।
- চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন কীর্তিচন্দ্র।
- ১৯৩৮ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের তিব্বতি ভাষার অনুবাদ আবিষ্কার করেন।
অন্যদিকে,
- হলায়ুধ মিশ্র রচিত ‘নিরঞ্জনের রুষ্মা’ হচ্ছে অন্ধকার যুগের সাহিত্য নিদর্শন।
- রামাই পণ্ডিত রচিত শূন্যপুরাণ’ হচ্ছে অন্ধকার যুগের সাহিত্য নিদর্শন।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর; বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম এবং বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
- ডাকের কথায় নীতিকথা বেশি।
অন্যদিকে,
- খনার বচনগুলো কৃষি, আবহাওয়া, ঋতু, জ্যাতিশাস্ত্র সম্পর্কিত। এছাড়াও স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ের খনার বচন রয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।
ব্যাখ্যা
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ/কবিতা সংকলন/ গানের সংকলন।
- ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার থেকে এটি আবিষ্কার করেন।
- চর্যাপদের চর্যাগুলো রচনা করেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ।
- চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়েছে।
- ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন।
- তাঁরই সম্পাদনায় সাড়ে ৪৬টি পদবিশিষ্ট পুথিখানি হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা (১৯১৬) নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
- তিনি পুথির সূচনায় একটি সংস্কৃত শ্লোক থেকে নামের যে ইঙ্গিত পান তাতে এটি চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় নামেও পরিচিত হয়।
- তবে সংক্ষেপে এটি ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা ‘চর্যাপদ’ নামেই অভিহিত হয়ে থাকে।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর এবং বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদ ও রাজ বংশ:
বাংলার পাল বংশের রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁদের আমলে চর্যাগীতিকাগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। পাল বংশের পরে বাংলাদেশে সেন, বর্মণ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার পৌরাণিক হিন্দুধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসেবে গৃহীত হয় এবং দেশি ভাষা বাংলার স্বয়ংকৃত ভাষা প্রাধান্য লাভ করে।
পাল রাজাদের উদারপন্থী বৌদ্ধ মতবাদের পরিবর্তে সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্য ধর্মমতের প্রাধান্যের ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যেরা এদেশ থেকে বিতাড়িত হয়। সেন রাজাদের প্রতাপের জন্যই বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছিল। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাইরে নেপালে পাওয়া গেছে।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড. মাহাবুবুল আলম।
রূপা থোই নাহিক ঠাবী।।
বাহতু কামলি গঅণ উবেসে।" - চর্যাপদে এই পদের রচয়িতা কে?
ব্যাখ্যা
- তিনি খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রারম্ভের কবি। তিনি জালন্ধরীপার গুরু ছিলেন।
- তিনি কঙ্কর নামক স্থানের রাজপুত্র ছিলেন, মতান্তরে তাঁর জন্মস্থান ছিল উড়িষ্যা।
- তিনি চর্যাপদের ৮নং পদটি রচনা করেন।
কম্বলাম্বরপা রচিত পদ:
"সোনে ভরিতী করুণা নাবী।
রূপা থোই নাহিক ঠাবী।।
বাহতু কামলি গঅণ উবেসে।"
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদ ও লুইপা:
- চর্যাপদ মানে হলো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের লিখিত প্রথম নিদর্শন।
- এটি বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের দ্বারা রচিত এক প্রকার সাধনমূলক গীতিকবিতা।
- এর ভাষা রীতি হলো কথ্য ভাষারীতি।
- ড. সুনীতিকুমারের মতে চর্যাপদের ভাষা পশ্চিম বঙ্গের উপভাষা।
- এবং ড. শহীদুল্লাহর মতে চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বঙ্গকামরূপী অথবা প্রাচীন বাংলা ভাষা।
- চর্যাপদের ভাষাকে সন্ধ্যাভাষা ও বলা হয়।
- ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবার গ্রন্থাগার থেকে এটি আবিষ্কার করেন।
- চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন কীর্তিচন্দ্র।
- ১৯৩৮ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের তিব্বতী ভাষার অনুবাদ আবিষ্কার করেন।
- চর্যাপদের প্রথম পদ রচয়িতা লুইপা।
- অনেক পণ্ডিত লুইপাকেই প্রথম চর্যাগীতি রচয়িতা বলে মনে করেন।
- তাঁর জীবিতকাল ছিল ৭৩০–৮১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
- সে সময় বিহার রাজ্যের ধর্মপালের রাজত্বকাল চলছিল।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লুইপাকে চর্যাপদর প্রাথমিক কবি হিসেবে অভিহিত করেন।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি ছিলেন রাঢ় অঞ্চলের লোক।
- চর্যার ১ম ও ২৯তম পদ তাঁর রচিত বলে মনে করা হয়।
- এছাড়া তার ৫টি সংস্কৃত গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়।
উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস – মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা – সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
• কাহ্নপা:
- চর্যাপদের পদকর্তার মধ্যে সর্বাধিক পদ রচনা করেন- কাহ্নপা।
- তিনি ছিলেন শজিয়া তান্ত্রিক বৌদ্ধযোগী।
- তিনি ধর্মশাস্ত্র ও সঙ্গীত শাস্ত্র উভয় দিকেই দক্ষ ছিলেন।
- কাহ্নপা ১৩ টি পদ রচনা করেন।
- কাহ্নপা রচিত ২৪ নং পদটি পাওয়া যায় নি।
- চর্যাপদে তাঁর কাহ্নিল, কাহ্নি, কৃষ্ণাচার্য, কৃষ্ণবজ্রপাদ, কাহ্নু নাম পাওয়া যায়।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
ভুসুকুপা:
- চর্যাগীতি রচনার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হলেন ভুসুকুপা।
- তাঁর রচিত আঁটটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে সংগৃহীত হয়েছে।
- নানা কিংবদন্তি বিচারে ভুসুকুপা নামটিকে ছন্দ নাম বলে মনে করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শান্তিদেব।
- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে শান্তিদেব ভুসুকু সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বর্তমান ছিলেন।
- ভুসুকুর জীবৎকালে শেষ সীমা ৮০০ সাল। ধর্মপালের রাজত্বকালে (৭৭০-৮০৬ সাল) ভুসুকুপা জীবিত ছিলেন।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- শহীদুল্লাহর মতে তিনি কম্বলাম্বরপার সমকালীন অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রথম দিকের কবি ছিলেন।
- তারানাথের মতে তিনি ছিলেন মেবারের রাজা এবং গোরক্ষনাথের শিষ্য।
- শহীদুল্লাহ্ উল্লেখ করেছেন: 'তাঁহার ভাষা অনেকটা বাঙ্গালা বটে; কিন্তু উড়িয়া ভাষা বলাই সঙ্গত।'
অন্যদিকে,
- জালন্ধরীপার শিষ্য ছিলেন - বিরুপা।
- কবি শবরপা - তিনি ছিলেন নাগার্জুনের শিষ্য।
চর্যাপদ:
- বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন চর্যাপদ।
- চর্যাপদের প্রায় সমসাময়িক কালে বাংলাদেশে যে সব সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রত্যক্ষ উপকরণ নয়।
- বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদগুলো সম্পর্কে ১৯০৭ সালের আগে কোন তথ্যই জানা ছিল না।
- মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তৃতীয় বার নেপাল সফর কালে নেপালের রাজগ্রন্থাগার থেকে ১৯০৭ সালে সে সাহিত্যের কতকগুলো পদ আবিষ্কার করেন।
- তাঁর সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে সে সব পদ ১৯১৬ সালে (১৩২৩ সনে) চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণপাদের দোহা এবং ডাকার্ণব-এ চারটি পুঁথি একত্রে 'হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
- তিনি তাঁর Origin and Development of Bengali Language’ (ODBL) গ্রন্থে বিস্তারিত ভাবে ধ্বনিতত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে চর্যার পদসংকলনটি আদিতম বাংলা ভাষায় রচিত।
- এটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তাঁর খ্যাতি দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘ভাষাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
- চর্যাপদ সম্পর্কিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত গ্রন্থের নাম - Buddhist Mystic Songs।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত গ্রন্থ- হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা গ্রন্থে চর্যাপদের পরিচয় পাওয়া যায়।
- ১৮৮২ সালে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর ‘Sanskrit Buddhist Literature in Nepal’ গ্রন্থে নেপালে বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম ও বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
- তিনি Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে প্রমাণ করেন।
- গ্রন্থটি সংক্ষেপে ODBL নামে পরিচিত। এটি ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
- চর্যাগীতির বৈয়াকরণ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে ভাষা আলোচনা করে দেখালেন চর্যাপদ ‘বাংলা নিশ্চয়ই, বাংলার প্রায় মূর্তি
অবহটঠের সদ্যোনির্মোক মুক্ত রূপ।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- বিজয়চন্দ্র মজুমদার ১৯২০ সালে প্রথম চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।
- ১৯২৬ সালে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় 'The Origin and Development of the Bengali Language' গ্রন্থে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিস্তারিতভাবে চর্যাপদের ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাংলা ভাষার সম্পদ। অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানী এ অভিমত সমর্থন করেন।
- ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. সুকুমার সেন, ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত চর্যাপদের ভাষা, বিষয়বস্তু, প্রভৃতি আলোচনা করে প্রমাণ করেন যে-চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত।
- ১৯৪৬ সালে ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত সহজযান প্রসঙ্গে চর্যাপদের অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন।
- বিহারের বিখ্যাত পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, বৌদ্ধ সহজযান ও চর্যাগীতিকা নিয়ে ইংরেজি ও হিন্দিতে প্রচুর গবেষণা করেন।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদ:
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ/কবিতা সংকলন/ গানের সংকলন।
- এটি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।
- ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবার গ্রন্থাগার থেকে এটি আবিষ্কার করেন।
- তাঁরই সম্পাদনায় পুথিখানি হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা (১৯১৬) নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
- তিনি পুথির সূচনায় একটি সংস্কৃত শ্লোক থেকে নামের যে ইঙ্গিত পান তাতে এটি চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় নামেও পরিচিত হয়।
- এটি 'বৌদ্ধগান ও দোহা' বা 'চর্যাপদ' নামেই অভিহিত হয়ে থাকে।
- চর্যাপদের চর্যাগুলো রচনা করেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ।
- চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়েছে।
- চর্যাপদ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন কীর্তিচন্দ্র।
- ১৯৩৮ সালে প্রবোধচন্দ্র বাগচী চর্যাপদের তিব্বতি ভাষার অনুবাদ আবিষ্কার করেন।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।
ব্যাখ্যা
- বাংলার শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে -
- প্রাচীন যুগ (৯৫০ - ১২০০),
- মধ্যযুগ (১২০১ - ১৮০০) এবং
- আধুনিক যুগ (১৮০১ - বর্তমান)।
- দীনেশ্চন্দ্র সেন, সুকুমার সেন, গোপাল হালদার, মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখের যুগ-সম্পর্কিত অভিমত উল্লিখিত যুগবিভাগকে সমর্থন করে।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মধ্য ও আধুনিক যুগের এই সময় মেনে নিলেও, তাঁর মতে, প্রাচীন যুগের সময়সীমা - ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ।
• যুগের এই তিনটি ভাগের মধ্যে আবার ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে অন্ধকার যুগ বলে।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
উৎসঃ শীকর বাংলা প্রশ্ন-পাঠ, মোহসীনা নাজিলা।
ব্যাখ্যা
• হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার থেকে ১৯০৭ সালে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা' শিরোনামে প্রকাশ করে।
• মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা' গ্রন্থে চারটি পুঁথি সংকলিত হয়েছে।
সেগুলো হলো:
- চর্যাচর্যবিনিশ্চয়,
- সরোজবজ্রের দোহাকোষ,
- কৃষ্ণচার্য পাদের দোহাকোষ,
- ডাকার্ণব।
• এগুলোর মধ্যে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় পুঁথিটি বাংলা, অন্য তিনটি বাংলা নয়, অপভ্রংশে রচিত।
• তবে চর্যাপদের মতই সেগুলোর সংস্কৃত টিকা সংযোজিত আছে।
• চারটি গ্রন্থ একত্রে ১৯১৬ সালে "হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা" নামে প্রকাশিত হয়।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
• চর্যার কবি লুইপা:
- লুইপা প্রবীণ বৌদ্ধসিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদের একজন কবি।
- 'লুইপা' রচিত চর্যার পদ সংখ্যা দুইটি। লুইপা চর্যাপদের ১ ও ২৯ নং পদ রচনা করেন।
- মুহাম্মদ শহীদুল্লার অনুমান: ৭৩০ থেকে ৮১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লুইপা জীবিত - ছিলেন।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, লুইপা রাঢ় অঞ্চলের লোক।
- 'চয্যাচর্যবিনিশ্চয়'- এর প্রথম কবি লুইপা। তিব্বতি ঐতিহ্যে প্রাপ্ত চুরাশি জন সিদ্ধাচার্যের নামের তালিকায় লুইয়ের নাম আদিতম।
- সে সময় ছিল রাজা ধর্মপালের রাজত্বকাল।
লুইপা রচিত চর্যাপদের প্রথম পদ-
'কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল।।'
উৎস:
১। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা এবং
২। বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
• বাংলা সাহিত্যকে প্রধানত তিনটি যুগে বা পর্যায়ে ভাগ করা হয়।
যথা:
১) প্রাচীন যুগ,
২) মধ্যযুগ,
৩) আধুনিক যুগ।
• বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগে ব্যক্তি ও সমষ্টিজীবনই প্রধান ছিল।
উল্লেখ্য,
• বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে ধর্মটাই মুখ্য ছিল, মানুষ হয়ে পড়ে গৌণ।
• আর আধুনিক যুগে মানুষ মুখ্য হয় এবং মানবতায় একমাত্র কাম্য হয়ে ওঠে। সে সঙ্গে যোগ হয় অন্ধবিশ্বাসের বদলে যুক্তিশীলতা। স্বাজাত্যবোধ, স্বদেশপ্রেম, ব্যক্তিস্বাধীনতা বিশেষ করে নারী-স্বাধীনতা আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা; বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
• ভুসুকুপা:
- চর্যাগীতি রচনার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হলেন ভুসুকুপা।
- তিনি সৌরাষ্ট্রের ক্ষত্রিয় রাজপুত্র ছিলেন বলে মনে করা হয়।
- তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮টি পদ রচনা করেন। তাঁর রচিত চর্যার পদগুলো হলো- ৬নং/ ২১নং/ ২৩নং/ ২৭নং/ ৩০নং/৪১নং/৪৩নং/ ৪৯নং।
- ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ত্র মতে তিনি পূর্ব বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ ছিলেন।
- তিনি তাঁর রচিত ৪৯নং পদে পদ্মা নদী (পঁউআ খাল) এবং 'বঙ্গাল' দেশ ও 'বঙ্গালী'র কথা বলেছেন।
৪৯নং পদ:
বাজ ণাব পাড়ী পউআঁ খালে বাহিউ।
অদঅ বঙ্গাল দেশ' লুড়িউ।
আধুনিক গদ্যে রূপান্তর:
বজ্র নৌকায় পাড়ি দিয়ে পদ্মাখালে বাইলাম। লুণ্ঠন করলাম অদ্বয় রূপ বাঙ্গাল দেশ।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা এবং চর্যাগীতি পাঠ, মাহাবুবুল হক।
ব্যাখ্যা
- চর্যাগীতি রচনার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হলেন ভুসুকুপা।
- তাঁর রচিত আঁটটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে সংগৃহীত হয়েছে।
- নানা কিংবদন্তি বিচারে ভুসুকুপা নামটিকে ছন্দ নাম বলে মনে করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শান্তিদেব।
- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে শান্তিদেব ভুসুকু সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বর্তমান ছিলেন।
- ভুসুকুর জীবৎকালে শেষ সীমা ৮০০ সাল।
- ধর্মপালের রাজত্বকালে (৭৭০-৮০৬ সাল) ভুসুকুপা জীবিত ছিলেন।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- চর্যাপদের ভাষাকে বলা হয় 'সন্ধ্যা' বা 'সান্ধ্য ভাষা'।
- এ ভাষা কোথাও স্পষ্ট, কোথাও অস্পষ্ট।
- তাই একে 'আলো-আঁধারি' ভাষাও বলা হয়।
- চর্যাপদের পদগুলো প্রাচীন কোন ছন্দে রচিত তা আজ বলা সম্ভপর নয়৷ তবে আধুনিক ছন্দের বিচারে এগুলো মাত্রাবৃত্ত ছন্দের অধীনে বিবেচ্য৷
চর্যাপদ বিষয়ক গবেষণা:
• ড. বিজয়চন্দ্র মজুমদার ১৯২০ সালে প্রপথম চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন।
• ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে ভাষা আলোচনা করে স্বীকৃতি দেন যে, চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত।
১৯২৬ সালে ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় 'দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দি বেঙ্গলি ল্যাংগুয়েজ' গ্রন্থে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিস্তারিতভাবে চর্যাপদের ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন চর্যাপদ বাংলা ভাষার সম্পদ। অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানী এ অভিমত সমর্থন করেন।
• ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. সুকুমার সেন, ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত চর্যাপদের ভাষা, বিষয়বস্তু, প্রভৃতি আলোচনা করে প্রমাণ করেন যে- চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত।
• ১৯২৭ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চর্যাপদের ধর্মতত্ত্ব বিশ্লেষণ করেন।
• ১৯৪৬ সালে ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত সহজযান প্রসঙ্গে চর্যাপদের অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন।
• বিহারের বিখ্যাত পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, বৌদ্ধ সহজযান ও চর্যাগীতিকা নিয়ে ইংরেজি ও হিন্দিতে প্রচুর গবেষণা করেন।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
লুইপা:
- লুইপা প্রবীণ বৌদ্ধসিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদের একজন কবি।
- মুহাম্মদ শহীদুল্লার অনুমান: ৭৩০ থেকে ৮১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লুইপা জীবিত ছিলেন।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, লুইপা রাঢ় অঞ্চলের লোক।
- লুইপা চর্যাপদের ১ ও ২৯ নং পদ রচনা করেন।
লুইপা রচিত চর্যার প্রথম পদটি:
কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল।।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা ও বাংলাপিডিয়া।
ব্যাখ্যা
• ''কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।'' - পঙ্ক্তিটির রচয়িতা: লুইপা।
- এটি চর্যাপদের প্রথম পদ।
পদ - ১:
''কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল।।''
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ
লূই ভণই গুরু পূছিহ জাণ।।
• লুইপা:
- তিনি প্রবীণ বৌদ্ধসিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদের কবি ছিলেন।
- মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অনুমান: ৭৩০ থেকে ৮১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে লুইপা জীবিত ছিলেন।
- 'চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল''- পদটির রচয়িতা- 'লুইপা'।
- এটি চর্যাপদের প্রথম পদ।
- তিনি চর্যাপদে দুটি পদ লিখেছেন।
- লুইপা চর্যাপদের ১ ও ২৯ নং পদ রচনা করেন।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদ:
- চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।
- চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয় ১৯০৭ সালে (১৩১৪ বঙ্গাব্দে) এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৩ বঙ্গাব্দে) কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয়।
- প্রাচীন এ গ্রন্থটির সম্পাদনা করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।
- সুকুমার সেনের 'বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস' (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে চর্যাপদের ২৪ জন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে চর্যাপদের ২৩ জন কবির নাম উল্লেখ আছে।
- চর্যাপদের পদগুলো সন্ধ্যা বা সান্ধ্যাভাষায় রচিত। চর্যাপদের চর্যাগুলো রচনা করেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ। চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়েছে।
- চর্যাপদ গ্রন্থের প্রথম পদটির রচয়িতা লুইপা। চর্যাপদের অন্যান্য কবিরা হলেন- সরহপা, শবরপা, লুইপা, ডোম্বীপা, ভুসুকুপা, কাহ্নপা, কুকুরীপা, মীনপা, আর্যদেব প্রমুখ।
- কাহ্নপা সর্বাপেক্ষা বেশি ১৩টি পদ রচনা করেন।
- ভুসুকুপা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ টি পদ লেখেন।
উৎসঃ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড. মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
• চর্যাপদের কবি নন - মাহীধরপা।
চর্যাপদের কবিগণ:
- চর্যার কবিতের সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ আছে:
- সুকুমার সেনের 'বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস' (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থে চর্যাপদের ২৪ জন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে চর্যাপদের ২৩ জন কবির নাম উল্লেখ আছে।
কবিগণ হলেন:
- কাহ্নপা; কুক্কুরীপা; ধর্মপা; ঢেণ্ডণপা; বিরুপা; বীণাপা; ভাদেপা; ভুসুকুপা, মহীধরপা, লুইপা; শবরপা; শান্তিপা; সরহপা; ডোম্বীপা; কম্বলাম্বরপা; গুণ্ডরীপা; চাটিল্লপা; আর্যদেবপা; দারিকপা; তাড়কপা; কঙ্কণপা; জয়নন্দীপা; তন্ত্রীপা।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- পদকর্তারা একত্রে বসে এই চর্যা সমূহ রচনা করেননি।
- এই পদকর্তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থান করতেন , কেউ কেউ আজকের বাংলাদেশেও ছিলেন।
- ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের কবি ভুসুকুপাকে বাংলাদেশের মানুষ বলে মনে করেন।
- ভুসুকুপা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ টি পদ লেখেন।
- ভুসুকুপা রচিত উল্লেখযোগ্য পংক্তি 'অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।'
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
- চর্যাপদের ভাষাকে কেউ কেউ সন্ধ্যাভাষা বা সন্ধাভাষা বলেছেন।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'আলো আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না। যাঁহারা সাধন-ভজন করেন, তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই।' এ কারণে চর্যার ভাষা সন্ধ্যাভাষা।
চর্যাপদ:
- বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শনের নাম চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাগীতিকোষ বা চর্যাগীতি বা চর্যাপদ।
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ/কবিতা সংকলন/ গানের সংকলন।
- চর্যাপদের বিষয়বস্তু বৌদ্ধ ধর্ম মতে সাধনভজনের তত্ত্ব প্রকাশ।
- চর্যাপদের চর্যাগুলো রচনা করেন বৌদ্ধ সহজিয়াগণ। চর্যাপদে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়েছে।
- মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপালের রয়েল লাইব্রেরি থেকে, ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয় বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন কবি শবরপা।
- তিনি ছিলেন নাগার্জুনের শিষ্য।
- শবরপার জীবনকাল ৬৮০ - ৭৬০ খ্রিস্টাব্দ বলে অনুমান করা হয়।
- শবরপা চর্যাপদের প্রথম পদকর্তা ও লুইপার গুরু ছিলেন।
- ২৮ ও ৫০ নং পদের রচয়িতা তিনি।
- সংস্কৃত ও অপভ্রংশ মিলে তিনি মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেন।
'শবরপা' রচিত উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি -
"উষ্ণা উষ্ণা পাবত তহিঁ সবই সবরী বালী।
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহাণ সবী গীবত গুঞ্জরী।।"
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, ড. সৌমিত্র শেখর।
ব্যাখ্যা
• 'কুক্কুরীপা' সম্পর্কিত তথ্য:
- কুক্কুরীপা চর্যাপদের ২, ২০ ও ৪৮নং পদের রচয়িতা। তাঁর রচিত ৪৮নং পদটি খুঁজে পাওয়া যায় নি।
- কুক্কুরীপা তান্ত্রিক নাম কিংবা ছদ্মনাম। কুলীন বা উচ্চবংশীয় হলেও কাব্যমূর্তির কারণে বা তান্ত্রিকতার আকর্ষণে তিনি এ নাম ব্যবহার করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। নামের সঙ্গে 'পা' যুক্ত থাকায় কেউ কেউ একে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাসূচক ছদ্মনাম বলে মনে করেন। তারানাথের মতে, সঙ্গে সবসময় একটি কুকুরী থাকত বলে তাঁর নামকরণ হয়েছে কুক্কুরীপা।
- কুক্কুরীপা বাংলার উত্তরখণ্ডের অধিবাসী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। অবশ্য হিন্দিভাষীরা তাঁকে কপিলাবস্তু বা বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের লোক বলেছেন।
- সংস্কৃত রচনা 'মহামায়াসাধন'-এর রচয়িতা হিসেবে কুকুরীপার নাম পাওয়া গেছে। এ থেকে অনুমিত হয়, তিনি মহামায়ার উপাসক ছিলেন। ড. শহীদুল্লাহ্ মতে, কুক্কুরীপা ৭৪০ থেকে ৮২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে জীবিত ছিলেন। ধারণা করা হয়, ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে রাজা ধর্মপালের শাসনামলে কুক্কুরীপা তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন।
কুক্কুরীপা রচিত অতিপরিচিত দুটি পঙ্ক্তি হলো:
"দিবসহি বহুড়ী কাউহি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরু জাই।।" - চর্যাপদের ২নং পদ।
এর চলিত বাংলা অর্থ- দিনে বউটি কাকের ভয়ে ভীত হয় কিন্তু রাত হলেই সে কামরূপ যায়।
উৎস: চর্যাগীতি পাঠ, ড. মাহবুবুল হক; বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড. মাহাবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
• বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ–এ সান্ধ্যভাষা (বা সন্ধ্যা ভাষা) ব্যবহৃত হয়েছে।
- চর্যাপদের প্রথম আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে সান্ধ্য ভাষা বলেছেন।
------------------------
• চর্যাপদ:
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
- চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধনা–ভজনমূলক গান।
- এটি যে ভাষায় রচিত, তাকে সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বলা হয়।
- কারণ এই ভাষা কোথাও স্পষ্ট, কোথাও অস্পষ্ট; তাই একে ‘আলো–আঁধারি ভাষা’ও বলা হয়।
- এই ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে রহস্যময় ও দ্ব্যর্থক, যাতে বাহ্যিক অর্থের আড়ালে গূঢ় সাধনাতত্ত্ব প্রকাশ পায়।
- চর্যাপদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই তর্ক চলে আসছে।
- কারণ হিন্দি, ওড়িয়া ও অসমিয়া ভাষার গবেষকরাও একে তাঁদের ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করেছেন।
- তবে শব্দের ব্যুৎপত্তি, ব্যাকরণ, ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য ও ভাষাবিবর্তনের ধারাবাহিক বিশ্লেষণে দেখা যায়—অন্য ভাষার তুলনায় চর্যাপদের সঙ্গে বাংলা ভাষার সাদৃশ্যই সবচেয়ে বেশি।
- বিজয়চন্দ্র মজুমদারের মতে চর্যাপদের ভাষায় বাংলা, ওড়িয়া ও মৈথিলী ভাষার প্রভাব থাকলেও তা মূলত হিন্দি ভাষা।
- ভাষাতাত্ত্বিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ব্যাকরণ ও ক্রিয়াপদের রূপ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষা না মৈথিলী, না হিন্দি, না ওড়িয়া, না অসমিয়া—বরং এটি প্রাচীন বাংলা।
- একই সিদ্ধান্তে উপনীত হন ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
- তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চর্যাপদের ধ্বনি, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে একে বাংলা ভাষার সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
- গবেষক রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভিন্ন মত দিলেও, অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানী শহীদুল্লাহ ও সুনীতিকুমারের সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করেছেন।
- ছন্দের দিক থেকে চর্যাপদের পদগুলো আধুনিক বিচারে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়।
- বিষয়বস্তু ও তত্ত্বগত বিশ্লেষণে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী, ড. সুকুমার সেন ও ড. শশীভূষণ দাশগুপ্তসহ বহু গবেষক একমত যে চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত।
উৎস:
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস — মাহবুবুল আলম;
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।
ব্যাখ্যা
- তারানাথের মতে শবর ছিলেন বঙ্গের একজন নাগাচার্য। তিনি নাগার্জুনের শিষ্য এবং লুইপা-র গুরু।
- ড. সুকুমার সেনের মতে শবর ছদ্মনাম। শবরের মতো জীবনযাপন করতেন বলে তনি 'সিদ্ধশবরী', 'শবরীস্বর' ইত্যাদি নামে পরিচিতি লাভ করেন।
- শবরপা ধর্মপালের রাজত্বকালে (৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) বর্তমান ছিলেন। তারানাথের মতে, তিনি নবম শতকের কবি। আর ড. সুকুমার সেন তাঁর জীবৎকালের সর্বনিম্ন সীমা দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগ বলে মনে করেন।
- শবরপা বিক্রমশীলায় বসবাস করেছেন। তাঁর রচিত পদে ভণিতার উল্লেখ নেই। তবে টীকায় সিদ্ধাচার্য শবরপা কথাটির উল্লেখ আছে।
- তিনি চর্যার ২৮ ও ৫০ নং পদের রচয়িতা। সংস্কৃত ও অপভ্রংশ মিলে তিনি মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেন।
- শবরপার রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: 'সহজোপদেশ স্বাধিষ্ঠান', 'বজ্রযোগিনীসাধন' 'চিত্তগুহ্যগাম্ভীরার্থ গীতি', 'মহামুদ্রাবজ্রগীতি', 'শূন্যতা ছবি' ইত্যাদি।
• শবরপা রচিত দুইটি উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি-
উষ্ণা উষ্ণা পাবত তহি সবই সবরী বালী।
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহাণ সরবী গীবত গুঞ্জরী মালী।।
উৎস: চর্যাগীতি পাঠ, মাহাবুবুল হক।
ব্যাখ্যা
ব্যাখ্যা
• সরহ পা:
- সরহ পা ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাঁর জন্মস্থান রাজ্ঞীদেশ সম্ভবত উত্তরবঙ্গ-কামরূপ ।
- কামরূপের রাজা রত্নপাল (১০০০-৩০ সাল) ছিলেন তাঁর শিষ্য।
- তিনি এগার শতকের প্রথমার্ধে জীবিত ছিলেন।
- তিনি অপভ্রংশ ভাষায় দোহাকোষ রচনা করেছিলেন।
- তাঁর পদাবলীর ভাষা ছিল বঙ্গ-কামরূপী।
- তিনি ছিলেন ভিক্ষু ও সিদ্ধা।তিনি বহু গ্রন্থের রচয়িতা।
অন্যদিকে,
• বীণাপা রচিত চর্যাপদের ভাষা ছিল বাংলা।
• শান্তিপা রচিত চর্যাপদের ভাষা ছিল প্রাচীন মৈথিলি।
• জয়নন্দীপা রচিত পদের ভাষা ছিল আধুনিক ভারতীয় আর্যভাষার প্রাচীন রূপ তথা প্রত্ন-মৈথিলি-উড়িয়া-বাংলা-আসামি।
উৎস: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, ড. মাহবুবুল আলম।
ব্যাখ্যা
- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যগ্রন্থ/কবিতা সংকলন/ গানের সংকলন।
- এটি বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন।
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থে চর্যাপদের ২৩ জন কবির নাম উল্লেখ আছে।
- চর্যাপদের প্রথম পদটি লুইপার। সে হিসেবে বাংলা সাহিত্যের আদি কবি লুই পা।
উৎস: বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা- ড. সৌমিত্র শেখর।